

আল্লাহর বিচারব্যবস্থা সর্বজনিন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমার নিয়মের কোনো পরিবর্তন নি। (সূরা-বনি ইসরাইল, আয়াত-৭৭)। সেক্ষেত্রে আল্লাহ কাফিরদের সাথেও অবস্থান করেন (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৯)। কাজেই আল্লাহ কাফির ও মমিন সকলের জন্য নিরপেক্ষ। অতএব, আল্লাহ নিজ ক্ষমতা বলে মুসাকে ইবলিসের প্রবঞ্চনা থেকে রক্ষা না করে বরং আল্লাহ এমন একটি চিহ্ন বা শায়ের এর ছদ্মবেশ ধারণ করে দেখা দিয়েছিল যেটা ইবলিস ধারণ করতে সক্ষম নয়। আর এটাই ছিল শায়ের আল্লাহ। আর আল্লাহ তার সেই শায়ের এর ছদ্মবেশ ধারণ করেই মুসাকে দেখা দিয়ে শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে তাকে নিরাপদ করেছিলেন। যে চিহ্ন দেখে মুসা তার প্রভুকে চিনে নিয়েছে যে এটাই স্বয়ং আল্লাহ। অনেকেই মনে করেন যে আল্লাহর কোনো শায়ের বা চিহ্ন নেই, কিন্তু না, আল্লাহর শায়ের বা চিহ্ন আছে মর্মে পবিত্র কোরআনের সূরা হজের ৩২ আয়াতে তা উল্লেখ আছে। এই আয়াতে বলা হয়েছে শায়ের আল্লাহ। শায়ের শব্দের অর্থ হচ্ছে এমন একটি চিহ্ন যা দেখে আপনজনকে চেনা যায়। (আরবি অভিধান পৃ. ১৫৩০)। কাজেই শায়ের আল্লাহ মানে আল্লাহকে চেনার জন্য একটি চিহ্ন। আল্লাহর সেই শায়ের দেখে প্রত্যেক নবীই আল্লাহকে চিনেছে, যার মাধ্যমে প্রত্যেক নবীকে ওহী কালীন সময়ে আল্লাহর ওহীকে ইবলিস থেকে হেফাজত করে। (সূরা-হিযর, আয়াত-৯ ও ১৭)
এখানে উল্লেখ্য যে, মরিয়মের সাথে আল্লাহর রুহ কথা বলার সময় পূর্ণ মানবাকৃতি (ছদ্মবেশ) ধারণ করে কথা বলেছিল (সূরা-মরিয়ম, আয়াত-১৭)। এই আয়াতে প্রমাণ হয় আল্লাহ রুহু মানবাকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করেন। অনেকেই বলেন এই আয়াতে আল্লাহর রুহু বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো হয়েছে। কথাটা ঠিক নয়, কারণ আল্লাহর রুহ বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো যাবে না। কেননা এই আয়াতে আল্লাহর রুহ বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো হলে এই পবিত্র কোরআনে যতগুলি আয়াতে আল্লাহ 'আমার রুহু' বলে উল্লেখ করেছেন, ততগুলো আয়াতে 'আমার রুহু' বলতে জিব্রাইলকে বুঝতে হয়। সেক্ষেত্রে সূরা হিযর এর ২৯ নং আয়াতে এবং সূরা ছাদের ৭২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'আমার রুহু আদমের ভিতরে প্রবিষ্ট করা হয়েছে' বলে উল্লেখ আছে। যদি আল্লাহর রুহ বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো হয় তাহলে আদমের ভিতরে ঐ সময় জিব্রাইলকে প্রবিষ্ট করা হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। সেক্ষেত্রে আদম, জিব্রাইল সংশ্লিষ্ট বলে প্রমাণ হয়। সেক্ষেত্রে আদমকে সেজদার মাধ্যমে জিব্রাইলকে সেজদা করার শামিল বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে জিব্রাইল সেজদাযোগ্য হয়ে যায়। কিন্তু জিব্রাইল সেজদাযোগ্য নয়, একমাত্র আল্লাহই সেজদাযোগ্য। (সূরা-জিন, আয়াত-১৮)। সেজদার মালিক একমাত্র আল্লাহ। (সূরা-হামীম সেজদা, আয়াত-৩৭)। জিব্রাইল সেজদাযোগ্য বিশ্বাস করা এটা দ্বীনের পরিপন্থি বুঝ বলে গণ্য হয়। কারণ পবিত্র কোরআনের মধ্যে একটি শব্দের অর্থ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করলে তা কোরআনের পরিপন্থি বলে গণ্য হয়। কাজেই সূরা মরিয়মের ১৭ নং আয়াতে 'আমার রুহু' বলতে জিব্রাইল কিংবা অন্য কোনো ফেরেস্তাকে বুঝাইলে সেটা কোরআনের পরিপন্থি বলে গণ্য হবে বিধায় উক্ত আয়াতে "আমার রুহু" বলতে আল্লাহরুহুকেই বুঝানো হয়েছে। আর মরিয়মের কাছে স্বয়ং আল্লাহর রূহ এসেছিল মরিয়মের গর্ভে ঈসা আ. কে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে (১৯ ঃ ১৯)। আল্লাহই স্বয়ং রূহ ফুৎকার করার মাধ্যমে ও কুন শব্দে মরিয়মের গর্ভে ঈসা আ. কে সৃষ্টি করেছিলেন। (সূরা তাহরীম-১২, সূরা আলে-ইমরান-৫৯, সূরা মরিয়ম-৩৫) এই মর্মে আল্লাহ্ বলেন অতঃপর মরিয়মের মধ্যে আমি আমার রূহ ফুৎকার করিয়া দিলাম (২১ ঃ ৯১)। যদি মরিয়মের কাছে জিবরাঈল আসত আর জিবরাঈল কুন শব্দে এবং রূহ ফুৎকার করার মাধ্যমে ঈসা আ. কে সৃষ্টি করেছেন বলে প্রতিয়মান হয়। সে ক্ষেত্রে জিবরাঈল সৃষ্টিকর্তা বলে গণ্য হয়। কিংবা কুন শব্দ বলার মালিক জিবরাঈল হয়ে যায়। কিংবা জীব্রাইল ঈসা (আ.) সৃষ্টির মাধ্যম বলে গণ্য হয় সেক্ষেত্রে জীব্রাইল ঈসা (আ.)-এর পিতা বলে গণ্য হয়। কিন্তু না, জিব্রাইল ঈসা (আ.)-এর পিতা নহে। বরং কোন মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আল্লাহ নিজেই ঈসা (আ.)কে সৃষ্টি করেছে। কারণ জীব্রাইল রুহ ফুৎকার করে কিংবা কুন শব্দ বলে কোনকিছু সৃষ্টি করার মালিক নহে। বরং রূহ ফুৎকারের মাধ্যমে কুন শব্দে সৃষ্টি করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর তাই ঈসা (আ.)-কে সৃষ্টি করার সময় স্বয়ং আল্লাহর রূহ এসেছিল মরিয়মের সাথে মানব আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে এটা নিশ্চিত। এই জন্য আল্লাহ্ বলেন পবিত্র আত্মা দ্বারা ঈশা (আ.)-কে আমি শক্তিশালি করিয়াছি (২ ঃ ৮৭) (৫ ঃ ১১০)। এই আয়াতের রুহুল কুদ্দুস পবিত্র আত্মা তথা আল্লাহ্র রূহকে বোঝানো হয়েছে। আর তাই সূরা মরিয়মের ১৭নং আয়াতে আমার রূহ বলতে কোন অবস্থায় জীব্রাইলকে বুঝানো যাবে না। যদি কেহ এমনটি বোঝেন তাহলে সেটা কোরানের পরিপন্থী বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই মুসার সাথে মানব সুরতের ছদ্মবেশ ধারণ করে আল্লাহ দেখা দিয়েছেন, এটা নিশ্চিত। এতে প্রমাণ হয় মানব সুরতই আল্লাহর শায়ের। তাই আল্লাহর রুহু মরিয়মের সাথে মানব আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করেই দেখা দিয়েছিলেন।
এখানে একটি প্রশ্ন থাকে যে, সূরা মরিয়মের ১৭ নং আয়াতে আল্লাহর রুহু কেন মানব আকৃতি ধারণ করল? এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছেÑ আল্লাহর একটি আকৃতি আছে, যেমন সূরা সাদের ৭৫ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর হাত আছে, সূরা কালামের ৪২ নং আয়াতে উল্লেখ আছেÑ আল্লাহর পা আছে এবং সূরা কাসাছ এর ৮৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর চেহারা ধ্বংস হবে না এবং সূরা সেজদার ৪নং আয়াতে উল্লেখ আছে, ৬ দিনে পৃথিবী তৈরি করে আল্লাহ আরশে আজীমে সমাসীন হলেন। যেখানে দাঁড়ানো এবং বসা উল্লেখ থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর একটি আকৃতি আছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর আল্লাহর সেই আকৃতিটাই হচ্ছে অতি উত্তম আকৃতি। আর আদমকে সেই অতি উত্তম আকৃতিতেই তৈরি করা হয়েছে। (সূরা-তীন, আয়াত-৪ নং এবং সূরা-মমিন, আয়াত ৬৪) এবং সূরা-রুমের ৩০ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর প্রকৃতি অনুসারেই মানুষ তৈরি। সূরা-ইনফিতর এর ৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহ বলেন, 'আমি যেমন তেমন আকৃতিতে মানুষ তৈরি করেছি, এইজন্য যে, যেন ইচ্ছামত ঐরূপে আহরণ করতে পারি।' এখানে উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে 'আইয়ু' সূরত শব্দ এসেছে। আইয়ু শব্দের আপেক্ষিক অর্থ হচ্ছে যেমন তেমন (আরবি অভিধান পৃ. ৬৩৮) ইংরেজিতে 'অং ষরশব ধং' আইয়ু শব্দের সাথে যে শব্দ ব্যবহৃত হবে সেই শব্দের অর্থের সাথে আইয়ু শব্দের অর্থ নির্ভর করে, যেমন তুমি আমাকে যেমনটা ধাক্কা দিলে আমিও তোমাকে তেমনটা ধাক্কা দিলাম। এই আয়াতে আইয়ু সূরত শব্দ এসেছে বিধায় আল্লাহর যেমন সূরত, তেমন সূরতেই আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াতে 'রাক্কাবাকা' শব্দ এসেছে, 'রাক্কাবাকা' শব্দের অর্থ হচ্ছে আহরণ করা (আরবি অভিধান পৃ. ১৩৭৪)। যেন ইচ্ছামত আল্লাহ মানব রূপে আহরণ করতে পারে।
উপরিউক্ত আলোচনায় বুঝা যায় যে, আল্লাহ পাকের নিজ আকৃতি ও প্রকৃতি অনুসারে মানুষ তৈরি করেছে, বিধায় মরিয়মের সাথে আল্লাহ পাকের রুহু মানব আকার ধারণ করে মরিয়মের সাথে কথা বলেছেন। অনেকেই বলেন, আল্লাহর পক্ষে মানব আকৃতি ধারণ করা যুক্তিসংগত নয়, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, একজন ফেরেস্তা যখন মানব আকৃতি ধারণ করতে পারে, (সূরা-আনআম, আয়াত-৯)। সেক্ষেত্রে আল্লাহ অবশ্যই মানবাকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করতে সক্ষম। কেননা আল্লাহ সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৪৮)। কাজেই আল্লাহর পক্ষে মানব আকৃতি ধারণ করা অসম্ভব নয়। এখানে উল্লেখ্য যে, মানব সুরত যদি আল্লাহর সায়ের হয়, আর আল্লাহ যদি মানব সুরতে ছদ্মবেশ ধরে তাহলেতো তাকে আমরা আল্লাহ না বলে মানুষ বলি, তাহলে মানব সুরতে প্রকাশ হয়ে আল্লাহর লাভ কি? কিন্তু না, ইবলিস যখন মানব ছুরত ধারণ করার পরও তাকে আমরা চিনার পরে মানুষ না বলে ইবলিস বলি এবং একটি ফেরেশস্তা যখন মানব রূপের ছদ্মবেশ ধারণ করে তাকে চেনার পর আমরা তাকে মানুষ না বলে ফেরেশতা বলে বিশ্বাস করি। এটা যেমন বিশ্বাসের বিষয় সেক্ষেত্রে আল্লাহ যদি মানব ছুরতের ছদ্মবেশ ধারণ করে। আর আমরা যদি চিনতে পারি। তাহলে কেন তাকে আল্লাহ বলে বিশ্বাস করা যাবে না? আসলে আল্লাহ মানব সুরত ধারণ করার মাধ্যমে মানুষের ইমান পরীক্ষা করেন, এটা ইমান পরীক্ষা করার আল্লাহর একটা কৌশল। অধিকাংশ লোক আল্লাহর এই কৌশলকে ভয় করে না। (সূরা-আরাফ, আয়াত-৯৯)। যে কৌশলে আল্লাহ আদমের মধ্যে নিজ রুহু ফুৎকার করে সেজদা দিতে বলেছিল সেক্ষেত্রে ইবলিস আল্লাহর এই কৌশল বুঝতে না পেরে সেজদা না দিয়েই কাফের হয়েছিল (সূরা-বাকারা, আয়াত-৩৪)। এখনও মানুষকে ইবলিস থেকে ইমান রক্ষা করার জন্য আল্লাহ রসূল পাঠায় (সূরা-নাহল, আয়াত-৩৬)। এইজন্য আল্লাহ মানুষের ইমান পরীক্ষা করার জন্য রসূল পাঠিয়েছেন। (সূরা-ফুরকান, আয়াত-২০)। এখন আমরা জানব ফেরেস্তারা মানব রূপ ধারণ করতে সক্ষম কি না? এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমি যদি ফেরেস্তাকে রসূল করে পাঠাতাম তাহলে তাকে মানব আকৃতিতেই পাঠাতাম (সূরা-আনআম, আয়াত-৯)। আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে রসূল করে পাঠায় (সূরা-হজ, আয়াত-৭৫)। যেমন ইব্রাহিমের কাছে আল্লাহ ফেরেস্তা রসূল পাঠিয়েছিলেন (সূরা-হুদ, আয়াত-৬৯)। আর সেই ফেরেস্তা রসূল মানব আকার ধারণ করে পৃথিবীতে অবতরণ করে মানুষের সাথে কথা বলে (সূরা-যাযিয়াত, আয়াত-২৫ )। (ইসলামি ফাউন্ডেশনের অনুবাদ- আল-কুরআনুল কারীম, টীকা -৬৬৩) এই টীকায় উল্লেখ আসছে, ফেরেস্তা রসূলগণ মানব আকার ধারণ করে ইব্রাহিমের সাথে কথা বলছেন। এতে প্রমাণ হয় যে, ফেরেস্তা মানব রূপ ধারণ করতে সক্ষম। মানব ছুরতে যখন ফেরেস্তা প্রকাশ হয় তখন আমরা তাকে মানুষ না বলে যেমন ফেরেস্তা বলে বিশ্বাস করি, তদ্রƒপ আল্লাহর রুহু যখন মরিয়মের কাছে মানব রূপ ধরে আসল তখন তাকে আমরা আল্লাহ রুহ বলে বিশ্বাস করিব, এটাই হচ্ছে মানব আকৃতিতে আল্লাহ বিশ্বাস করার দলিল। যেটা আকারে আল্লাহ বিশ্বাসে গণ্য। আর মৃত্যুর পরে মানুষের ইমান পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ মানব আকৃতিতে প্রকাশ হয়ে আল্লাহর পায়ে সেজদা করতে বলবে (সূরা-কালাম, আয়াত-৪২)। আল্লাহর রুহু যখন মানব আকার ধারণ করে প্রকাশিত হয়, আর মানুষের রূপের তো ভিন্নতা আছে, এই জন্য প্রভুর ঠিকানা সাব্যস্ত করতে বলা হয়েছে। (সূরা-নাবা, আয়াত-৩৯)। যাতে একটি নির্দিষ্ট রূপে আল্লাহকে চেনা সম্ভব হয় সেই নির্দিষ্ট মানব রূপ বলতে কোনটি হবে? এটা জানতে হলে নবীগণ আল্লাহকে কোন ছূরতে দেখেছে সেটা জানতে হয়। অনেকেই বলেন, কোনো নবী আল্লাহকে দেখেনি, কথাটা ঠিক নয়, কারণ নবী মোহাম্মদ (স.) আল্লাহকে দেখেছেন সূরা নজমের ১ থেকে ১৮ নং আয়াতের মধ্যে তা উল্লেখ আছে। এই সকল আয়াতে নবী মোহাম্মদ (সা.) যে স্বয়ং আল্লাহকেই দেখেছেন এই মর্মে ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও ইবনে আনাস (রাঃ) এর তাফছিরে মাযারীতে উল্লেখ আছে। সৌদী আরব থেকে প্রেরিত মা-আরেফুল কোরআনের ১৩০৩ পৃষ্ঠায় তা উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া সূরা নাজমের ৫নং আয়াতে বলা হয়েছে, 'সাদিদুল কুয়াই' অর্থাৎ প্রকৃত শক্তিশালী, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সৃষ্টিগত শক্তিশালী বলতে একমাত্র আল্লাহকেই বুঝতে হবে। কারণ 'সাদিদুল কুয়াই' শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকৃত শক্তিশালী। কারণ কুয়াই শব্দের অর্থ হচ্ছে শক্তিশালী (আরবি অভিধান পৃ. ২০০৮) সূরা নাজমের ৬নং আয়াতে উল্লেখ আসছে যে, যিনি শক্তির মালিক অতঃপর তিনি তার নিকট প্রকাশিত হলেন তার অনুরুপ আকৃতিতে। এখানে 'যু'-মিররাতিন। ফা-ইস্তাওয়াই। 'যু' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'মালিক' (আরবি অভিধান পৃ. ১৩২৯) আর মিররাতিন শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'শক্তি' (আরবি অভিধান পৃ. ২২২৭) 'ফা' শব্দের অর্থ অতঃপর এই আয়াতের মূল শব্দ 'ইস্তাওয়াই' শব্দের সাথে যোগ হয়েছে। এখন 'ইস্তাওয়াই' শব্দের অর্থ হচ্ছে বরাবর বা অনুরূপ (আরবি অভিধান পৃ. ২৭৮)। এই আয়াতে প্রমাণ হইল যে, আল্লাহ নবী মোহাম্মদ (স.) এর নিজ আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে দেখা দিয়েছিলেন। এখানে একটি প্রশ্ন থাকে যে, অনেকেই বলেন, এই আয়াতে নিজ আকৃতি বলতে আল্লাহর নিজ আকৃতি বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। কারণ এই আয়াতে আল্লাহ অন্য রূপের ছদ্মবেশ ধারণ ব্যতীত যদি নিজ আকৃতি ধারণ করে মোহাম্মদ (স.) এর সাথে কথা বলে বা দেখা দেয় তাহলে সূরা শুরার ৫১ নং আয়াতের পরিপন্থি বলে গণ্য হয়। কিংবা উক্ত আয়াতটি ব্যর্থ হয়। কোরআনের এক আয়াত আরেক আয়াতের পরিপন্থি নয় বিধায় আল্লাহর নিজ আকৃতিতে কথা বলেছেন কথাটা গ্রহণযোগ্য নয় বরং মোহাম্মদ (স.) এর নিজ আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে দেখা দিয়েছিলেন এবং কথা বলেছেন এটা গ্রহণযোগ্য। কারণ সূরা শুরার ৫১ নং আয়াতে ছদ্মবেশ কথাটা উল্লেখ আছে। অনেকেই বলেন, এই সকল আয়াতে জিব্রাইল তার নিজ আকৃতিতে মুহাম্মদের সাথে দেখা দিয়েছে, কথাটা ঠিক নয়, কারণ এই আয়াতে উল্লেখ আসছে যিনি শক্তির মালিক অর্থাৎ সৃষ্টিগত শক্তিশালী এবং সহজাত শক্তিসম্পন্ন তিনি মোহাম্মদ (স.) এর সাথে দেখা দিয়েছেন। আর সে ক্ষেত্রে আমরা তাকে জিব্রাইল বলে আখ্যায়িত করি, তাহলে জিব্রাইল শক্তির মালিক বলে গণ্য হয়, সেক্ষেত্রে জিব্রাইল আল্লাহর শরিক বলে গণ্য হয়। এটা পবিত্র কোরআনের পরিপন্থি, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। শক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ। (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৬৫)। কোনো কিছুতেই তার সমকক্ষ কেউ নেই। (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৬৫)। এতে প্রমাণ হয় যে মোহাম্মদ (স.) স্বয়ং আল্লাহকেই দেখেছে মোহাম্মদ (স.) এর অনুরূপ আকৃতিতে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল (সূরা-নজম, আয়াত-৯)। নবীর ছুরতের ছদ্মবেশ ধারণ করেই আল্লাহ নবীদের সাথে কথা বলেন, কারণ নবীদের সুরত ইবলিসের ধারণ করা সক্ষম নয়। কারণ প্রত্যেক নবীই নিজের চেহারায় সেজদাকারী (সূরা-আরাফ, আয়াত-২৯)। যেহেতু নবীগণ তাদের নিজের চেহারায় সেজদাকারী, সেহেতু তারা আদম কাবায় সেজদাকারী বলে গণ্য। ফলে ইবলিস নবীদের চেহারা ধারণ করেনা, এজন্য যে, ইবলিস আদম কাবায় সেজদাকারীদের শামিল হবে না। (সূরা-হিযর, আয়াত-৩৩)। ইবলিস আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (সূরা-বাকারা, আয়াত-৩৪)। আর এইভাবে নিজের চেহারায় সেজদার মাধ্যমেই আদম নিজেকে ইবলিস মুক্তি করেছিলেন। আর তাই ওহীকে আল্লাহ ইবলিস থেকে হেফাজত করার লক্ষ্যেই নবীগণের নিজের চেহারার ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলে থাকেন। আর এই ভাবেই আল্লাহ ওহিকে ইবলিস থেকে হেফাজত করেন (সূরা-হিযর, আয়াত-৯ ও ১৭)। সকল নবীদের ক্ষেত্রেই আল্লাহ একই পদ্ধতি দিয়েছেন, আল্লাহর নিয়মের কোন পরিবর্তন নেই (সুরা বনিইসলাইল-৭৭)। নবীদের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৩৬)। আর একই পদ্ধতিতে অর্থাৎ মুসা (আ.) এর নিজ আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করেই তুর পাহাড়ে আগুনের আলোকিত অবস্থার মধ্য থেকে আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছিলেন এটাই নিশ্চিত। আর তাই মুসা (আ.) তার নিজ ছুরতেই প্রভুকে দর্শন করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
উপরিউক্ত দর্শন বা বুঝ পবিত্র কুরআনের দর্শন এতে কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই যারা কুরআনের দর্শন প্রত্যাখ্যান করল তাদের জন্য শাস্তি। (৩৭ নং সূরা-সাফফাত, আয়াত-১৭০)। যারা কুরআর প্রত্যাখ্যান করে, তারা ফাছিক। (সূরা-বাকারা, আয়াত-৯৯) যারা কুরআনের বুঝ অপছন্দ করে তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে। (সূরা-মোহাম্মদ, আয়াত-৯)।
আল্লাহ বলেন, "তোমরা আমাকে ডাকো আমি ডাকে সাড়া দিব।" বাকারা ১৮৬ আয়াত ও মমিন ৬০ আয়াত। যেমন আল্লাহ সাড়া দিল হযরত জাকারিয়া (আ.) এর ডাকে। আম্বিয়া ৯০ আয়াত। এবং আল্লাহ সাড়া দিল হযরত ইউসুফ (আ.) এর ডাকে। ইউসুফ, ৩৪ আয়াত। আবার মমিন ব্যক্তিদের ডাকে আল্লাহ সাড়া দিয়ে থাকেন, শুরা ২৬ আয়াত। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেনÑ হুদ, ৬১ আয়াত। প্রভুর পক্ষ থেকে সাড়া পেতে হলে জানতে হবে প্রভু কোন প্রক্রিয়ায় মানুষের সাথে কথা বলেন। প্রভু মানুষের সাথে হিজাব ধারণ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলেন। শুরা-৫১ আয়াত। এখানে উল্লেখ্য যে, হিজাব অর্থ ছদ্মবেশ, আরবি অভিধান পৃষ্ঠা ১১৪৯। অনেকেই বলে, আল্লাহ পর্দা রেখে মানুষের সাথে কথা বলেন। কথাটা ঠিক নয় এজন্য যে, আল্লাহকে পর্দা করা অসম্ভব। কারণ আল্লাহকে পর্দা করার মত পর্দা আল্লাহ সৃষ্টিকুলে নেই। তা ছাড়াও আল্লাহকে পর্দা করলে পর্দার এক পাশে আল্লাহ অপর পাশে আল্লাহ অনুপস্থিত প্রমাণিত হয়। কিন্তু না, আল্লাহ কোথাও অনুপস্থিত নহে। (সূরা আরাফ : ৭) তা ছাড়াও আল্লাহ সর্বস্তরে মহিতুনভাবে সর্বত্র বিরাজমান। নেছার ১২৬ আয়াত। কাজেই আল্লাহকে পর্দা করা সম্ভব নয়। বিধায় আল্লাহ মানুষের সাথে কথা বলার সময় পর্দা রেখে কথা বলে এমন বুঝ ঠিক নয়। বরং আল্লাহ মানুষের সাথে হিজাব ধারণ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলে। এটাই সঠিক বুঝ। এখানে উল্লেখ্য যে, হেযাব শব্দের অর্থ পর্দা হবে তখনি যখন কথাটা সৃষ্ট দুই বস্তুর মধ্যে সংঘটিত হবে। কিন্তু হিযাব শব্দ যখন আল্লাহর সাথে হবে তখন হিযাব অর্থ ছদ্মবেশ অর্থ করতে হবে। হিজাব অর্থ ছদ্মবেশ, আরবি অভিধান পৃষ্ঠা ১১৪৯। কারণ আল্লাহকে পর্দা করা অসম্ভব। এখন জানতে হবে কোন ছদ্মবেশটা আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এই লক্ষ্যে প্রভুর দিকে একটি ঠিকানা সাব্যস্ত করতে বলা হয়েছে। নাবা ৩৯ আয়াত। এই আয়াতে মা-আবী শব্দ এসেছে। মা-আবী শব্দের অর্থ প্রত্যাবর্তন স্থল বা ঠিকানা। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আল কুরআনুল করিম অনুবাদ নাবার ২২ আয়াতে মা-আবী অর্থ প্রত্যাবর্তন স্থল বা ঠিকানা অর্থ করা হয়েছে। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব পেতে হলে প্রভুর প্রত্যাবর্তনস্থল বা অবতরণের একটি ঠিকানা সাব্যস্ত করতে হবে। আর প্রভু আপনার প্রতি রাজি হলে সেই ঠিকানার ছদ্মবেশ ধারণ করে আপনার ডাকে সাড়া দিবে ও দর্শন দিবে। এখন আপনাকে জানতে হবে প্রভুর সেই ঠিকানার গুণগত বৈশিষ্ট কী? কেননা এই পর্য্যায়ে মানুষকে প্রবঞ্চনা দিয়ে থাকে ইবলিস। এই মর্মে প্রভু মানুষকে সতর্ক করে বলেন, "সেই প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই তোমাকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চনা না করে।" লোকমান ৩৩ আয়াত ও ফাতির ৫ আয়াত। আর এই পর্যায়ে মানুষকে অলীক আকাংক্ষায় মোহাচ্ছন্ন করে এবং মহা প্রতারক তাদেরকে প্রতারিত করে। হাদিদ ১৪ আয়াত। যেহেতু ইবলিস আল্লাহ সম্পর্কে মানুষকে প্রবঞ্চনা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেহেতু আল্লাহর ছদ্মবেশ ধারণের ঠিকানা সাব্যস্ত করতে গিয়ে এমন একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। যেক্ষেত্রে ইবলিসের অনুপ্রবেশ যেন না ঘটে। অর্থাৎ এইজন্য আমাদেরকে জানতে হবে ইবলিস কোথায় প্রবেশ করতে সক্ষম নয়। কিংবা ইবলিস কোথায় অবস্থান করে না। আমরা জানি ইবলিস আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফির। বাকারা, ৩৪ আয়াত। ইবলিস যে কায়দায় বিভ্রান্তিতে পড়ে আদমকে সেজদা করে নি ঠিক একই কায়দায় মানুষকে এই সেজদা থেকে বিরত রাখার জন্য বিভ্রান্ত করবে। এই জন্য মানুষকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, ইবলিস যেভাবে বিভ্রান্তিতে পড়েছিল সেই কায়দায় মানুষকে বিভ্রান্তি করবে। আরাফ ১৬ আয়াত। এবং সে মানুষকে এই সেজদা দিতে বাধা দিবে। নামল ২৫ আয়াত। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "হে মানুষ! তোমরা সেজদাকারীদের সাথে উঠা বসা কর।" শু-আরা, ২১৯ আয়াত। তোমরা সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। হিজর, ৯৮ আয়াত। তোমরা মাথা নতকারীর সাথে মাথা নত কর। বাকারা, ৪৩ আয়াত। যেহেতু ইবলিস আদম কাবায় সেজদা দিবেনা বিধায় সে সকলকে ঐ সেজদা থেকে বিরত রাখার জন্য চেষ্টা করে। আদম কাবায় সেজদা দেওয়াই সিরাতুল মুস্তাকিম। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "ইহাই সিরাতুল মুস্তাকিম যা আমা পর্যন্ত পৌঁছে।" হিজর ৪১ আয়াত। আর এই আদম কাবায় সেজদা দিয়ে অধিকাংশ মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত হয় এবং এই সেজদা না দিয়েই অধিকাংশ মানুষ পথ ভ্রষ্ট হয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "ইহা দ্বারা অধিকাংশ মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত এবং ইহা দ্বারাই অধিকাংশ মানুষ পথভ্র।"" বাকারা ২৬ আয়াত। পক্ষান্তরে আল্লাহ বলেন, "তোমরা ঐখানে সেজদা কর এবং আমার নিকটবর্তী হও। ইবলিসের অনুসরণ করিওনা।" আলাক ১৯ আয়াত। আল্লাহ বলেন, "হে মমিনগণ তোমরা পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ কর এবং কোনকিছুতেই ইবলিসের অনুসরণ করিওনা। কারণ ইবলিস তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, বাকারা ২০৮ আয়াত। কাজেই একটি বিষয় পরিষ্কার যে, যারা আদমকাবায় সেজদাকারী বা আদম কাবায় মাথানতকারী তাদের সাথে ইবলিস অবস্থান করে না। কারণ ইবলিস কখনো আদমকাবায় সেজদা করবে না। ফলে ইবলিসমুক্ত একটা ঠিকানা প্রভুর দিকে সাব্যস্ত করতে হলে আদম কাবায় সেজদাকারী এবং আদমকাবায় মাথানতকারী একজন সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদমকাবায় সেজদার মাধ্যমেই ইবলিসমুক্ত হতে হবে। এ জন্য আল্লাহ বলেন সম্যক গুরুর তথা রসূল তোমাদের কে পবিত্র করবেন বাকারা ১৫১ আয়াত।
এখন আমাদের জানতে হবে প্রকৃতপক্ষে কারা আদম কাবায় সেজদা দিয়ে ইবলিসমুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কারা আদম কাবায় সেজদাকারী ও মাথানতকারীর দল। তার একটি গুণগত বৈশিষ্ট্য যদি না থাকে তাহলে আমরা সম্যক গুরু চিনতে গিয়ে ইবলিসের ধোঁকায় পড়তে পাড়ি। এই গুণগত বৈশিষ্টের একটি স্পষ্ট প্রমাণ প্রভুর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে অবশ্যই এসেছে। উহা যারা দেখল তারা লাভবান আর যারা না দেখিল তারা ক্ষতিগ্রস্ত। আনআম ১০৪ আয়াত। আর যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর দর্শন লাভ না করতে পারছে ততক্ষণ পর্যন্ত সে নিশ্চিত বিশ্বাসী হতে পারছে না। যখন প্রভুর দর্শন লাভ করল তখন সে নিশ্চিত বিশ্বাসী হইল। আর যখন সে বিশ্বাসী হইল তখন সে ঈমানের অনুমতি লাভ করিল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেহই ঈমান অর্জন করিতে পারিবে না (ইউনুস-১০০)। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিশ্চিত বিশ্বাসী না হও ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি প্রভুর ইবাদত কর।" হিজর ৯৯ আয়াত। যখন মানুষ এই স্তরে পৌছায় তখন তার জন্য দ্বীন কায়েমের হুকুম হয়। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "তুমি মমিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করে।" শুরা ১৩ আয়াত। এই স্তরে পৌছানো মানুষের পরিচয় হচ্ছে সে শুধু তার প্রভুকেই ভালোবাসে, আর প্রভু তাকে ভালোবাসে। সর্বক্ষেত্রে সে তার প্রভুর বিজয় কামনা করে। সে সারাক্ষণ প্রভুর দ্বীন কায়েমে ব্যস্ত থাকে। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, তোমরা কোরআনের মাধ্যমে কাফেরদের সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাও। (সূরা ফুরকান : ৫২) কারণ কুরআনের দ্বীনই একত্মবাদের দ্বীন। আর যারা এই দ্বীন থেকে সরে গিয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, "তোমরা যখন প্রকৃত দ্বীন থেকে সরে যাবে, তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়ে এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসা হবে, তারা শুধু আল্লাহকেই ভালোবাসে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসে। তারা নিন্দুকের নিন্দা পরোয়া করে না।" মায়িদা ৫৪ আয়াত। এই সম্প্রদায় অর্থাৎ এরাই হচ্ছে আল্লাহর বন্ধু, কারণ তারা আল্লাহ ও (সম্যক গুরু) তথা রসূলকে বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রভুর দর্শন লাভ করে প্রভুর নৈকট্য প্রাপ্ত হওয়ার মাধ্যমে ছিদ্দিক ও শহীদের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েছে। সেজন্য আল্লাহ বলেন, "যারা আল্লাহ ও রসুলের বিশ্বাসী, তারা ছিদ্দিক ও শহীদ। হাদিদ, ১৯ আয়াত। এরা আল্লাহর পথে ব্রত থাকা অবস্থায় নিহত হয়ে অমরত্ব লাভ করে। অর্থাৎ মরে না। বাকারা, ১৫৪ আয়াত। এদেরকে মৃত বলিওনা, এরা জীবিত, এরা প্রভুর নিকট হতে জীবিকা প্রাপ্ত হয়। ইমরান, ১৬৯ আয়াত। তারাই প্রভুর নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি। ওয়াকিয়া, ১১ আয়াত। অর্থাৎ যারা সম্যকগুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা দিয়ে ইবলিসমুক্ত হয়ে পবিত্র কোরআন মোতাবেক সমস্ত কাজ করে তারাই সঠিক, তারাই সম্যকগুরু।
কাজেই শুধু আল্লাহকেই ডাকলেই হবেনা, বরং আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহ সাক্ষাতে বিশ্বাসী হয়ে একজন সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আল্লাহর দর্শন লাভ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব লাভ করা ছাড়া মানব মুক্তির কোনো পথ নেই, কারণ আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর ডাকে যে সাড়া দেয় নি, সে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে। আহকাফ, ৩২ আয়াত।
অতএব, আমাদের উচিত উপরিউক্ত বর্ণনার আলোক একজন সম্যক গুরু তথা রসুলের সঙ্গ ধারণ করে প্রভুর দর্শন লাভ করা।
প্রভুর দর্শনের স্পষ্ট প্রমাণের মধ্যেই কিন্তু Who is the Allah এর Ans. নিহিত আছে। আল্লাহ সম্পর্কে মানুষের জিজ্ঞাসা হচ্ছে তিনটি। একটি হচ্ছে Who is the Allah আর অপরটি হচ্ছে What is the Allah? এখন What is the Allah? এর Ans. পবিত্র কোরআনের মধ্যে বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে। যেমন এখলাসে বলা হয়েছে কিন্তু এখলাসে Who is t he Allah এর Ans. নেই। এই জন্য আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেন, "আমি তোমাদের জন্য দুইটি পথ রাখলাম (১) আমার বিধান যেটা এই কোরআন অপরটি হচ্ছে (২) আল্লাহ প্রাপ্তির স্পষ্ট পথ। মায়েদা ৪৮ আয়াত। এখানে মিনহাযা বলতে স্পষ্ট পথকে বুঝানো হয়েছে।
বর্তমান বিজ্ঞান ভিত্তিক মানব সমাজে এই বিষয়টা অজানা। আর এই অজানা বিষয়টাই হচ্ছে প্রভুর দর্শনের স্পষ্ট প্রমাণটা। সেটাই সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে জানতে হবে। সম্যক গুরু অর্থাৎ রসূলই আল্লাহর ঠিকানা অর্থাৎ রসূলের হাতই আল্লাহর হাত (সূরা ফাতহ-১০) এখানেই What is the Allah? Where is the Allah? এর Ans. নিহিত আছে। আর তাই আল্লাহ বলেন রসূল তোমাদেরকে অজানা বিষয়টি শিক্ষা দিবেন। বাকারা ১৫১ আয়াত। সম্যক গুরুর কাছে গিয়ে Who is the Allah এবং Wher e is the Allah? এর Ans. টা লাভ করতে হবে। এই লক্ষে পবিত্র কোরআনে এসেছে, হে প্রভু, রসূলের মাধ্যমে যে বিষয়টি আমাদেরকে দিতে চেয়েছ সেটা আমাদেরকে দাও। ইমরান ১৯৪ আয়াত।
এই বিষয়টা আমাদের সকলের দরকার বিধায় সম্যক গুরুর প্রকৃত পরিচয়টা এই খানেই, ভক্ত যখন তার সম্যক গুরু তথা রসূল সুরতকে প্রভুর ছদ্মবেশ ধারণের ঠিকানা সাব্যস্ত করে প্রভু দর্শনের প্রচেষ্ঠায় রত হয় সম্যকগুরুকে স্বয়ং রসূল বিশ্বাস করে ঐ সুরতেই প্রভুর বিশ্বাস নিশ্চিত হয়। তখন সে ঐ সুরতটা দৃষ্টিতে আয়ত্ব করতে পারে না। এটাই হচ্ছে সম্যক গুরুর প্রকৃত প্রমান। সেই স্পষ্ট প্রমান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন "কোন দৃষ্টি তাকে অবধারণ করতে পারবে না।আনআম ১০৩ আয়াত। আবার এ সমস্যাটা বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানের ভাষায় ব্যাক্ত করেন--সে যে চমকে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায় যায়না তারে বাধা, নাগাল পেলে পালায় ঠেলে লাগায় চোখে ধা ধা।" সম্যক গুরুর পরিচয়টা দৃষ্টি দ্বারাই পরীক্ষা করে নিতে হবে। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "তোমাকে দৃষ্টি শক্তি দিয়েছি, যাতে তুমি বিষয়টা পরীক্ষা করে নিতে পার।" দাহর ২ আয়াত।
যখন কোনো মানুষ কঠোর সাধনার মাধ্যমে প্রভুর অনুমতি লাভ করবে তখনই প্রভুর দর্শন লাভ করবে। আর তথনই সে মমিন হবে বা ইমান অর্জন করবে। এইজন্য আল্লাহ বলেন, "তোমরা আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ ইমান অর্জন করতে পারবে না।" ইউনুস ১০০ আয়াত। অর্থাৎ যখনই সে প্রভুকে দর্শন করল তখন তার ইমান শক্ত হইল। এই জন্য আল্লাহ বলেন "মোমেনের পরিচয় হচ্ছে প্রভুর সাক্ষাত লাভ।" হুদ ২৯ আয়াত। প্রভুর দর্শনের আগে যে কোনো ভাবে ইবলিস তাকে ঐ পথ থেকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। কিন্তু যখনই সে প্রভুর দর্শন লাভ করল তখন তার ইমান কায়েম হইল। এই পর্যায়ে ইবলিস তাকে আর পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো মানুষ তার প্রভুর দর্শন লাভ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার ঈমানে কায়েম থাকতে পারবে না। বিধায় প্রভু বলেন, "আমার ইচ্ছা ছাড়া কেউই ইমান অর্জন করতে পারবে না।" আনাম ১১১ আয়াত। যখন কোনো মানুষ উপরিউক্ত প্রক্রিয়ায় কঠোর সাধনার মাধ্যমে প্রভুর ইচ্ছা লাভ করবে তখনই প্রভুর দর্শন লাভ করবে। এইজন্য আল্লাহ বলেন, "আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত করেন, আর যাকে ইচ্ছা তাকে পথভ্রষ্ট করেন।" রাদ, ২৭ আয়াত। এবং যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র করে থাকেন। নুর, ২১ আয়াত। এবং যাকে ইচ্ছা তাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। নুর, ৪৬ আয়াত এবং হজ, ১৬ আয়াত। এবং যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন, এবং যাকে ইচ্ছা তাকে শাস্তি দেন। ফাতহ্, ১৪ আয়াত। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে অনুগ্রহ করেন এবং যাকে ইচ্ছা তাকে শাস্তি দেন। আনকাবুত, ২১ আয়াত। উপরিউক্ত আয়াত বিশ্লেষণে জানা গেল আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ ছাড়া আল্লাহ পাকের শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ নেই। (সূরা নূর : ২৩) এখন আমাদেরকে সতর্ক থাকতে আমরা কোনো অবস্থায়ই যেন আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হই। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "যারা আল্লার সাক্ষাৎ অস্বীকার করে তারাই আল্লার অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়।" আনকাবুত, ২৩ আয়াত। সকল মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত একমাত্র বিশ্বাসী ব্যক্তিগণ ব্যতীত। (সূরা আসর : ১) তাহলে দেখা গেল দোযখমুক্তির বা বেহেশতপ্রাপ্তির পূর্ব শর্ত হচ্ছে ঈমান অর্জন করা। আর ঈমান অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে, আল্লাহর অনুমতি লাভ। (সূরা ইউনুস : ১০০)। আর ঈমান অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে আল্লাহর দলভুক্ত হওয়া। আর আল্লাহর দলভুক্ত হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে ইবলিসের দল থেকে বহি®কৃত হওয়া। আর ইবলিসের দল থেকে বহি®কৃত হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে ইবলিসের সাথে বিরোধিতা করা। আর ইবলিসের সাথে বিরোধিতা করার পূর্বশর্ত হচ্ছে ইবলিস বিরোধী কাজ করা। অর্থাৎ যে কাজ ইবলিস পছন্দ করে না। আর সেই কাজটি হচ্ছে আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা করা। কারণ ইবলিস আদমকাবায় সেজদা না করেই কাফের। (সূরা বাকারা : ৩৪) অতএব আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা দিলেই ঈমানের অনুমতি লাভ হবে। আর ঈমান অর্জন করলেই দোযখমুক্তি বা বেহেশত লাভ। কাজেই সকল কিছুই নির্ভর করছে আল্লাহ পাকের সাক্ষাৎ বা দর্শন লাভের উপর। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যখন একজন সম্যক গুরুর ভক্ত হয়ে আদম কাবায় সেজদা দেওয়ার পর ইবলিস থেকে মুক্ত হয়ে কঠোর সাধনার মাধ্যমে প্রভুর দর্শন লাভ করে তখনই সে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভ করে বিধায় সে পথ ভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি পেয়ে হেদায়েত প্রাপ্ত হয় এবং সে পবিত্র হয় এবং সৎপথে পরিচালিত হয়, আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হয় এবং শাস্তি থেকে রেহাই প্রাপ্ত হয়। এই স্তরে এসে প্রভুর দর্শন লাভ না করা পর্যন্ত যে কোনো মুহূর্তে মানুষ প্রভুকে পাওয়ার প্রচেষ্টায় গিয়ে শেরেক করে ফেলতে পারে। এইজন্য আল্লাহ বলেন, "আমার ইচ্ছা ছাড়া কেউ শেরেক থেকে বাঁচতে পারবে না।" আনাম ১০৭ আয়াত। আদম কাবায় সেজদার মাধ্যমে যখন ইবলিসের দল থেকে নাম কাটা পরবে এবং আল্লার দলভুক্ত হয় তখনই তাকে আল্লাহ ঈমানের অনুমতি দিবেন, আর তখন সে মুমিন হবে। ফলে সে প্রভুর দর্শন লাভ পাওয়ার ফলে সে শেরেক থেকে মুক্তি পাবে।
আল্লাহ বলেন, "আমার কাছে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ আছে। নেসা ১৩৪ আয়াত। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকের জগতের মানুষ দুনিয়ার লোভ লালসায় মত্ত হয়ে "আল্লার দর্শনের আশা পোষণ না করে শুধু পার্থিব জীবনের সন্তোষ্টি এবং ইহাতেই পরিতৃপ্ত থাকে।" ইউনুস ৭ আয়াত। আর এই জন্যই তারা প্রভুর কাছে ইহকালের কল্যাণ কামনা করে। যারা দুনিয়ার শোভা কামনায় মত্ত হয়ে প্রভুর কাছে দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করল ফলে প্রভু তাকে দুনিয়ার কল্যাণ দান করল। কিন্তু সাথে সাথে এটাও জানিয়ে দিল যে, "যারা ইহকালের কল্যাণ কামনা করে তাদের পরকালে কোনো অংশ নেই" বাকারা ২০০ আয়াত। তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের তুলনায় বেশী ভালবাসিল এবং মানুষকে আল্লাহর দর্শনের পথ থেকে নিবৃত করল ও আল্লাহর পথকে বক্র করল, তারা বিভ্রান্তিতে আছে।" ইব্রাহিম ৩ আয়াত। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, "যে কেউ আখেরাতের ফসল কামনা করে আমি তাকে তার ফসল বর্ধিত করি এবং যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু দেই, কিন্তু আখেরাতে তার জন্য কিছুই নেই।" শুরা ২০ আয়াত। তখন তাদের নিজের ভুল তারা বুঝতে পারিল যে, দুনিয়া চাওয়ার পরে দুনিয়ার কল্যাণ লাভ করেছে, ফলে তাদের জন্য আখিরাতের শাস্তি নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে, তখন তারা আখেরাতের কল্যাণ পাওয়ার আশায় এবং আখিরাতের শাস্তির ভয়ে তারা বলিল, হে প্রভু আমাকে দুনিয়ার কল্যাণ দান করেছ এবং আখেরাতের কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতের অগ্নি থেকে বাঁচাও। বাকারা ২০১ আয়াত। এই লক্ষে তারা বিভিন্নভাবে নেকী সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত রহিল এই ভেবে যে, আখিরাতে যখন নেকী ওজন করা হবে তখন আমার নেকীর পাল্লা ভারি হলে আমার আমলনামা ডান হাতে পাব এবং আমি জান্নাতে যেতে পারিব। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, "তোমরা আল্লাহকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে কেউ ব্যর্থ করতে পারবে না।" হুদ ২০ আয়াত। বিধায় আখেরাতের শাস্তি থেকে তারা রেহাই পাবে না।
তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, "যে কেউ প্রার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে দুনিয়াতে আমি তাদের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাদের কম দেওয়া হবে না।" হুদ, ১৫ আয়াত। কিন্তু তাদের জন্য আখিরাতের অগ্নি ব্যতীত কিছই নেই। হুদ ১৬ আয়াত। তারা আখিরাতের শাস্তি থেকে বাচার জন্য যা কিছু ইবাদত বন্দেগী ও দোয়ার মাধ্যমে নেকী সংগ্রহ করল আল্লাহ বলেন, "তারা যা কিছু করল আখেরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করল তা নিরর্থক হবে।" হুদ ১৬ আয়াত। কাজেই যারা দুনিয়ার কল্যাণ চেয়েছে তা দেওয়া হয়েছে, এখন তাদের জন্য আখিরাতের কল্যাণ দেওয়া হবে না বরং আখেরাতে তাদের জন্য শাস্তি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। তাদের উচিত হবে এই পথ পরিহার করে অর্থাৎ দুনিয়ার কল্যাণ কামনা থেকে বিরত থেকে একমাত্র প্রভুর প্রেমিক হওয়া। কারণ এই দুনিয়া খুব অল্প সময় (ইউনুস ৪৫ আয়াত)। এই দুনিয়া যেন একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যার সমতুল্য। নাযিআত ৪৬ আয়াত। দুনিয়ার জীবন আখেরাতের তুলনায় এক দিন বা একদিনের কিছু অংশ (মুমিন, ১১৩ আয়াত)। কাজেই এই অল্প সময়ের কল্যাণ চেয়ে সীমাহীন সেই আখিরাতের শাস্তিতে পতিত হওয়া এটা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। বরং এই অল্প সময়টা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হয়ে এই অল্প সময়কে সম্বল করে যদি আমরা সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় সেজদা করে ইবলিস থেকে মুক্ত হয়ে কঠোর সাধনার মাধ্যমে প্রভুর দর্শন লাভ করে তার প্রেম অর্জন করতে পারি, তবে আমাদের জীবন সার্থক হবে। তাই যারা ইতিপূর্বে না বুঝে দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করে দুনিয়ায় মত্ত্ব আছেন সেখান থেকে ফিরে আসুন। প্রভুর কাছে ক্ষমা চান। আপনার আখিরাতের শাস্তি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। সেই শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একজন সম্যক গুরু তথা রসূলই আপনাকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে। আর সেই লক্ষেই একজন সম্যক গুরু তথা রসূলের সঙ্গ ধারণ করে প্রভুর দর্শন লাভ করে তাকে ডাকতে থাকেন, অবশ্যই প্রভুর পক্ষ থেকে ডাকের সাড়া পাবেন। মোমেন ব্যক্তির ডাকে প্রভু সাড়া দিয়ে থাকেন। (সূরা শুরা : ২৬) যখনই আপনি এই স্তরে এসে প্রভুর প্রেম অর্জন করবেন তখনই আপনার মধ্যে এমন একটি ভাব উদয় হবে যে, আমি ইহকাল বা পরকাল কিছুই চাহিনা। "আমি শুধু চাই আমার অপরাধ ক্ষমা কর এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে আমার পা-কে দৃঢ় রাখ।" ইমরান ১৪৭ আয়াত।
ঠিক তখনই আপনি ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ লাভ করবেন। ইমরান ১৪৮ আয়াত। কাজেই সম্যক গুরু তথা রসূলের সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দিয়ে ইবলিস মুক্ত হয়ে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ লাভের একমাত্র পথ।
প্রভুর পক্ষ থেকে আশা প্রভু দর্শনের স্পষ্ট প্রমাণটা যারা না দেখল তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আনআম ১০৪ আয়াত। অর্থাৎ যারা সম্যক গুরু তথা রসূলের সঙ্গ ধারণ না করে আল্লাহকে অদেখা অবস্থায় এভাবে ইবাদত বন্দেগী করলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এইভাবে যে, অদেখা কোনো বিষয় স্মরণযোগ্য নয়। এটা বিজ্ঞান ভিত্তিক সত্য বটে। এটা আবার বাস্তব ও দর্শন ভিত্তিক সত্য। ধরুন, আপনি ঢাকা কমলাপুর ষ্টেশনটা দেখেছেন, আর তাই আপনি উহা স্মরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন, আর লন্ডনের শহরটা আপনি দেখেন নি বিধায় লন্ডন শহরটা আপনি স্মরণ করতে পারছেন না। এতে প্রমাণ হয় যে, অদেখা কোনো বিষয় স্মরণযোগ্য নয়।
এখন আমরা দেখব, এই কথাটা কোরআন ভিত্তিক কতখানি সত্য। পবিত্র কোরআনের মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা আল্লাহ স্মরণ করতে বলে নি, অথচ অতীতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে স্মরণ কথাটা উল্লেখ আছে। যেমন "ভবিষ্যতের ঘটনা যেদিন তাদেরকে একত্রিত করা হবে।" সাবা, ৪০ আয়াত। যখন কেয়ামত উপস্থিত হবে, বনী ইসরাইল ৭১ আয়াত। এই সকল আয়াতে ভবিষ্যতের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। বিধায় এখানে 'স্মরণ কর' শব্দ আসে নি। আবার অতীতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে 'স্মরণ কর' কথা উল্লেখ আছে। যেমন মরিয়মের ৪১ আয়াতে অতীত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে 'স্মরণ কর' শব্দ এসেছে। আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী ও মহাজ্ঞানী। কারণ ভবিষ্যতের ঘটনা যেহেতু অদেখা আর অদেখা বিষয় যেহেতু স্মরণযোগ্য নয় বিধায় পবিত্র কোরানে ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে 'স্মরণ কর' কথা উল্লেখ করেন নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, অদেখা বিষয় স্মরণযোগ্য নয়। কথাটা কোরআন ভিত্তিক ও সত্য বটে।
এখন যাদের কাছে আল্লাহ এখনও অদেখা, তারা আল্লাহকে স্মরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন না। কারণ অদেখা বিষয় স্মরণযোগ্য নয়।
যারা আল্লাহকে স্মরণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় ফলে, আল্লাহ সম্পর্কে একটা ধারণা ও কল্পনা বা অনুমান করে বসে। যা গ্রহণযোগ্য নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "ধারণা কল্পনা বা অনুমান সত্য সম্পর্কে মোটেও ফলপ্রসু নয়।" ইউনুস ৩৬ আয়াত। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যাদের কাছে আল্লাহ অদেখা তারা আল্লাহকে স্মরণ করতে সক্ষম নয়। বিধায় তারা আল্লার স্মরণে গাফিল থাকে, ফলে ইবলিস শয়তান তাদের সঙ্গী হয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "যারা আল্লার স্মরণে গাফেল, শয়তান তাদের সঙ্গী হয়।" যুখরুফ ৩৬ আয়াত। কারণ তারা আদম কাবায় সেজদা দিয়ে ইবলিস মুক্ত হয়ে প্রভুর দর্শন লাভ করে নি।
ফলে তাদের ক্বালব বা অন্তর ইবলিস থেকে মুক্ত নয়। বিধায় সেদিন তারা পরিত্রাণ পাবে না। আল্লাহ বলেন, "বিশুদ্ধ অর্ন্তকরণ ব্যতীত কেউ পরিত্রাণ পাবেনা।" শুয়ারা ৮৯ আয়াত।
আবার আল্লাহর নাম জপনাকে আল্লাহর জিকির মনে করে সারাক্ষণ আল্লাহ, আল্লাহ নাম জপনা করে বা তাজবীহ গননায় ব্যস্ত থাকে। শুধু নাম জপনা করা পরিত্রাণের পথ নয়, কারণ আল্লাহ বলেন, "তোমরা আল্লাহকে ডাক" বাকারা ১৮৬ আয়াত। "তোমার প্রভুর নাম পাঠ কর" আলাক ১ আয়াত। এই সকল আয়াত দিয়ে আল্লাহকে ডাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু শুধু আল্লাহকে ডেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবেনা, কারণ ইবলিসও আল্লাহকে প্রভু বলেই ডাকে। হিযর ৩৬ আয়াত। আপনি আল্লাহকে প্রভু বলে ডাকেন, শুধু এই নাম জপনায় যদি আপনার পরিত্রাণ হয়, তবে ইবলিসও পরিত্রাণযোগ্য হয়ে যায়। তাই আল্লাহ বলেন, "তোমরা আল্লাহর নাম স্মরণ কর" নুর ৩৬ আয়াত ও দাহর ২৫ আয়াত। নাম ডাকা এক জিনিষ আর নাম স্মরণ করা কিন্তু ভিন্ন জিনিস। নাম স্মরণের মধ্যে নামের সাথে রূপ দর্শন এসে যায়, অর্থাৎ নামের সহিত রূপ আসে যখন তখনই নাম স্মরণ করা হয়। আল্লাহ বলেন, "তোমরা অধিক ভাবে আল্লাহকে স্মরণ কর।" আনফাল ৪৫ আয়াত। যাদের কাছে আল্লাহ অদেখা তারা আল্লাহকে স্মরণ করতে ব্যর্থ বিধায় তারা যখন সালাত আদায় করতে যায়, তখন তাদের মন স্থির হয় না। কারণ সে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে না। ফলে তার মন বিভিন্ন চিন্তায় ছুটে বেড়ায় বিধায় সালাতে সে একনিষ্ঠ হতে পারে না। ফলে তার জন্য সালাত কঠিন হয়ে যায়। এই জন্য আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় সালাত তাদের জন্য কঠিন, যাদের অন্তরে একনিষ্ঠতা নি।" বাকারা ৪৫ আয়াত। যাদের অন্তরে প্রতিপালকের দর্শনের ধারণা আছে, তারাই একনিষ্ঠবান হতে পারে। বাকারা ৪৬ আয়াত। কাজেই যারা প্রভুর দর্শন লাভ করে নি, তাদের জন্য সালাত কঠিন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "তোমরা আমার স্মরণে সালাত কায়েম কর" তাহা ১৪ আয়াত। কাজেই যারা আল্লাহর স্মরণে ব্যর্থ, তারা সালাত কায়েমে ব্যর্থ। কারণ সালাতের সাথে স্মরণের সম্পর্ক আর স্মরণের সাথে দেখার সম্পর্ক। স্মরণ করতে হলে দেখা শর্ত। কাজেই যাদের কাছে আল্লাহ অদেখা, তারা আল্লাহকে স্মরণ করতে পারছেনা বিধায় তাদের সালাত কায়েম হচ্ছে না। এইভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত।
যারা আল্লাহর দর্শন লাভ না করে মারা গেল, তারা আল্লাহর স্মরণে বিমুখ ছিল বিধায় তাদেরকে যখন পুনরুত্থান দিবসে উঠানো হবে তখন তারা অন্ধ অবস্থায় উঠিবে। তাহা ১২৪ আয়াত। তখন তারা বলিবে, দুনিয়াতে তো আমাদের চক্ষু ছিল, আমরা কেন অন্ধ অবস্থায় উঠিলাম? তাহা ১২৫ আয়াত। কাজেই দেখা যাচ্ছে, যারা মৃত্যুর পূর্বে প্রভুর দর্শনে ব্যর্থ হওয়ায় আল্লার স্মরণে বিমুখ থাকায় সেদিন তারা অন্ধ অবস্থায় উঠিবে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "যে কেউ ইহকালে অন্ধ থাকিবে, সে পরকালেও অন্ধ থাকিবে।" বনি ইসরাইল ৭২ আয়াত। এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে যে, ইহকালে আল্লাহকে দেখা যাবে না, দেখতে গেলে শেরেক হওয়ার আশংকা বিধায় আমরা রোজ কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখিব। যেহেতু সেদিন তারা অন্ধ থাকিবে, তাই প্রভু সম্মুখে থাকলেও প্রভু দর্শনে অন্তরিত থাকিবে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, "সেদিন তারা প্রভু থেকে অন্তরালে থাকবে।" মুতাফ্ফিফীন ১৫ আয়াত।
কাজেই যারা দুনিয়াতে আল্লাহর সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তারা প্রভু দর্শন লাভ না করায় প্রভুর স্মরণে গাফেল ছিল বিধায় তারা পরকালে অন্ধ অবস্থায়ই উঠিবে এবং তারা পথভ্রষ্ট ছিল বলে প্রতীয়মান হবে। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ নেকীর পাল্লা ভারী করার মাধ্যমে আমলনামা ডান হাতে পেয়ে জান্নাতে যেতে পারবে এমন আশায় বিভিন্ন ইবাদত বন্দেগী ও সৎ কর্মের মাধ্যমে যে সকল নেকী সংগ্রহ করেছিল। সেদিন তাদের কর্মফল নিষ্ফল হবে ও ওজনের জন্য কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। এই মর্মে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, "যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ অস্বীকারকারী তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে। কেয়ামতের দিন তাদের জন্য ওজনের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না।" কাহফ ১০৫ আয়াত। ফলে তারা যে সকল নেকী সংগ্রহ করেছিল তা সকলই বিনষ্ট বিধায় তারা সেদিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মনে রাখবেন, কোরআনের এই দর্শন যদি আপনার অপছন্দ হয় তাহলে আপনার সকল কর্মফল বিনষ্ট হবে। মোহাম্মদ, ৯ আয়াত। প্রভুর প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপরই তোমাদের বুঝকে প্রতিষ্ঠিত কর। নিজের মনগড়া অর্থাৎ খেয়াল খুশি অনুসরণ করিওনা। মোহাম্মদ, ১৪ আয়াত। এই কোরআন সম্বন্ধে অভিনিবেশ সহকারে যারা চিন্তা না করে তাদের অন্তর তালাবদ্ধ থাকবে। মোহাম্মদ, ২৪ আয়াত। কাজেই কোরআনের দর্শনই হচ্ছে অন্তরের তালা খোলার একমাত্র উপায়।
অনেকেই বলেন মানুষের বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নীচে একটি মাংসপি- আছে, এটাকে ক্বালব বলে। উহা পবিত্র হলে সমস্ত অজুদ পবিত্র হয়, কথাটা ঠিক নয়। এমন কথা পবিত্র কোরআনের কোন আয়াতে উল্লেখ নেই। তাছাড়া মানুষের বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নীচে যে মাংসপি-টি আছে সেটাকে হৃদপি- বলে, যার ইংরেজি হচ্ছে ঐবধৎঃ এটা পবিত্র বা অবপবিত্র হওয়ার কিছু নেই। এর কাজ হচ্ছে রক্ত সঞ্চালন করা, এটা কাফির ও মমিনের জন্য একই প্রক্রিয়ায় চলে। বিধায় এটা ক্বালব নয়। ক্বালব শব্দের অর্থ হচ্ছে অন্তর (সূরা তওবা : ১৫), যার ইংরেজি হচ্ছে গরহফ এর অবস্থান হচ্ছে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "মানুষ এবং তার অন্তর এর মাঝখানে আল্লাহ অবস্থান করেন।" আনফাল ২৪ আয়াত। আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, "আমি মানুষের গর্দানের শাহারগ অপেক্ষা অতি নিকটে আছি।" কাফ ১৬ আয়াত। কাজেই বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নীচে যদি ক্বালব হয়, আর সেখানে যদি আল্লাহর অবস্থান হয়, তাহলে সূরা ক্বাফ ১৬ আয়াতটা মিথ্যা প্রতিয়মান হয়। কারণ গর্দানের শাহারগ অপেক্ষা বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নীচের মাংসপি-টি অধিক দূরত্ব, তাই উক্ত আয়াতের দূরত্বের সাথে গড়মিল দেখা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআনে ছুদুর শব্দটি মন বা অন্তর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (সূরা হুদ : ৫, সুরা যুমার : ২২) আর ছুদুরের আভিধানিক অর্থ কোনো বস্তুর উপরিভাগ। (আঃ অভিঃ পৃঃ ১৫৮২) যেহেতু মনমস্তিষ্ক মানুষের দেহের উপরিভাগ সেহেতু ছুদুর বলতে এখানে মনমস্তিষ্ককেই বুঝানো হয়েছে। আর ছুদুরের অভ্যন্তরেই কলব বা অন্তর অবস্থিত। (সূরা হজ : ৪৬) কাজেই ক্বালব বা অন্তর মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে এটাই প্রমাণিত হয়। তাছাড়াও বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নীচের এক টুকরা মাংসপি- যেটাকে হৃদপি- বলে তা পবিত্র হলে সমস্ত দেহ পবিত্র হবে এমন কথা পবিত্র কোরআনে নেই।
আল্লাহ বলেন, আদমের নিমিত্তে সেজদা কর (আরাফ ১১ আয়াত) (বারাকা, ৩৪ আয়াত), (হিজর, ২৯ আয়াত), (বনি ইসরাইল, ৬১ আয়াত), (কাহফ, ৫০ আয়াত), (ত্বাহা, ১১৬ আয়াত), (সাদ, ৭২ আয়াত)। অনেকেই মনে করে এই সকল আয়াতে আদম সত্তাকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে ফেরেস্তারা ব্যক্তি আদমকে সেজদা দিয়েছে। এই বুঝটা ঠিক নয়। কারণ সেজদা একমাত্র আল্লাহর হক (৪১ ঃ ৩৭)। আল্লাহ ছাড়া সেজদা হারাম। অর্থাৎ সকল সেজদা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে (জিন ১৮ আয়াত)। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি আদম সেজদা পাওয়ার অধিকারী এমন বিশ্বাস করলে আদমের নিমিত্তে সেজদার আয়াতগুলোর সাথে জিন ১৮ আয়াত পরস্পর বিরোধী বলে গণ্য হয়, কিন্তু না এই কোরআনের কোনো আয়াত অন্য কোনো আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধী নয়, অর্থাৎ এই কোরআনের এক আয়াত আরেক আয়াতের পরিপন্থি নয় বরং এক আয়াত আরেক আয়াতের পরিপূরক এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকেই মনে করে যে, আদম হয়ত ফেরেস্তাদের থেকে উত্তম ছিল, তাই ফেরেস্তারা ব্যক্তি আদমকে সেজদা দিয়ে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে আদমকে। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়, কারণ যদি আয়াতে বলা হত, ওয়াসজুদুলি ইনসানা তাহলে ফেরেশতা ও জিন থেকে ইনসান শ্রেষ্ঠ আর তাই ইনসানকে সেজদা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু না, কিন্তু এখানে এমন আয়াত নেই বিধায় শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আদমকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঐ সেজদার হুকুম ছিল না এটা নিশ্চিত। আদম ফেরেস্তার দলভুক্ত হওয়ার আশায় ইবলিসের ধোঁকায় পড়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষ থেকে ভক্ষণ করেছিল (আরাফ ২০ আয়াত)। এতে বুঝা যায় যে, আদম নিজেকে ফেরেস্তা থেকে উত্তম মনে করে না। তা ছাড়া ইবলিস নিজেকে আদম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দাবী করেছে (আরাফ ১২ আয়াত)। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব তারাই, যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে (ব্যানিয়া, ৭ আয়াত)। পক্ষান্তরে নিকৃষ্ট জীব তারাই, যারা কাফির, অতঃপর ইমান আনে না (আনফাল, ৫৫ আয়াত)। কাজেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট এটা জন্মগত বা সৃষ্টিগত ব্যাপার নয়, এটা কর্মফলের ব্যাপার। কাজেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট বুঝাবার লক্ষে আদমের নিমিত্তে সেজদার হুকুম হয় নি এটা নিশ্চিত। বরং আদম সেজদার অন্য কারণ আছে, সেটা হচ্ছে এই যে, আদমের মধ্যে দুইটি স্বত্তার অস্তিত্ব স্থাপন করা হয়েছে। (১) ব্যক্তি আদম সত্তা, যেটাকে নফ্স নামে অভিহিত করা হয়েছে। আদমের মধ্যে যখন নফ্স সত্তা স্থাপন করা হয়েছিল তখন সেজদার হুকুম হয় নি, কারণ প্রত্যেক নফসের মৃত্যু আছে (আনকাবুত, ৫৭ আয়াত)। ২য়টি হচ্ছে সৃষ্টার নিজস্ব সত্তা যেটাকে রুহু নামে অভিহিত করা হয়। আসলে রুহু প্রভু স্বত্তা (বনি ইসলাইল, ৮৫ আয়াত)। আদমের মধ্যে যখন আল্লাহর নিজ রুহু তথা প্রভু সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল তখনই সেখানে সেজদার হুকুম হয়েছিল (হিজর, ২৯ আয়াত) এবং (সাদ, ৭২ আয়াত)। তাহলে দেখা গেল, ফেরেস্তারা আদমকে কেবলা করে ব্যক্তি আদম সত্তাকে বিলীন করে বরং আল্লাকেই সেজদা দিয়েছে বিধায় আদমের নিমিত্তে সে সকল সেজদার হুকুম ছিল সেটা ছিল আল্লাহর উদ্দেশ্যই সেজদা, তাই এই সকল সেজদাও দ্বীনি সেজদা। কারণ সেজদার ব্যবহার বা প্রয়োগ কখনো দুনিয়াবি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বরং সেজদার ব্যবহার বা প্রয়োগ সবসময়ই হবে দ্বীনের ক্ষেত্রে। যেহেতু দ্বীনের সকল বিষয় একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য (যুমার, ৩ আয়াত)। সেহেতু আদমের নিমিত্তে যে সেজদা ছিল, সেটাও নিশ্চয়ই আল্লাহর উদ্দেশ্যে। তবে এখানে আর একটি বিষয় পরিষ্কার ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন যে তিনটি কারণে আল্লাহ আদমের নিমিত্তে সেজদা দিতে বলেছিল তা নিম্নরূপ ঃ আল্লাহর নিজ রুহু আদমের মধ্যে ফুৎকার করা হয়েছিল। (হিজর, ২৯ আয়াত) এবং (সাদ, ৭২ আয়াত)। আল্লাহর সুন্দর আকৃতি ও প্রকৃতি অনুসারে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে (ত্বীন, ৪ আয়াত), (রুম, ৩০ আয়াত)। আদম আল্লাহর খলিফা। (বাকারা, ৩০ আয়াত)। এই আয়াতে খলিফা শব্দ এসেছে, খলিফা শব্দের অর্থ স্থলাভিষিক্ত করা। আরবি অভিধান, পৃ. ১২৬৬)। উপরিউক্ত ৩টি কারণে ফেরেস্তারা আদমকে কেবলা করে আল্লাহকে সেজদা দিয়েছে বিধায় উপরিউক্ত আয়াতগুলোকে আদমের নিমিত্তে যে সেজদার হুকুম ছিল, তা মূলত আল্লাহকেই সেজদা। ফলে ঐসকল আদম সেজদার আয়াতগুলি জিন এর ১৮ আয়াতের পরিপন্থী হয় নি বা পরস্পর বিরোধী হয় নি। এখানে উল্লেখ্য যে, জন্ম সূত্রে সকল আদম সন্তানই খলিফা নয়। বরং পৃথিবীতে যারা ইমান আনবে এবং সৎ কর্ম করবে তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে আল্লাহ খলিফা নির্ধারণ করেন (নূর, ৫৫ আয়াত)। এইজন্য আল্লাহ বলেন, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি রিসালাতের ভার অর্পণ করেন (আনআম, ১২৪ আয়াত)। রিসালাতের ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণই হচ্ছে রসূল। আর রসূলগনের কাবায় বনি আদমগণ সেজদা দিয়েই মমিন হবেন। এই বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যেই পবিত্র কোরআনে আদমের নিমিত্তে সেজদার জন্য উপরিউক্ত আয়াতগুলিতে বার বার নির্দেশ এসেছে। অনেকেই মনে করেন, এই সকল আয়াতগুলি শুধু ফেরেস্তারাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, বনি আদম এর জন্য প্রযোজ্য নয়। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছিÑ এই আয়াতের ব্যবহার বা প্রয়োগ শুধু ফেরেস্তাদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিলনা, কারণ ইবলিস জিন জাতীয় (কাহফ, ৫০ আয়াত)। ইবলিস জিন হওয়া সত্বেও যখন আদমকে সেজদা না দিয়েই কাফের, এতে প্রমাণ হয় ঐ সকল আয়াতগুলি জিনদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। বেহেশতের মধ্যে আদমের সাথে তাঁর স্ত্রীও উপস্থিত ছিল। (সূরা বাকারা : ৩৫) আর ইবলিস ব্যতীত উপস্থিত সকলে সেজদা করল। (সূরা বাকারা : ৩৪) তাতে প্রমাণ হয় যে, বেহেশতের মধ্যে মা হাওয়া আ. আদম আ. কে সেজদা দিয়েছে। আর তাই বনি আদমের মধ্যেও এই সেজদার প্রয়োগ ও ব্যবহার এসেছে ইউসুফের ১০০ আয়াতে, ইউসুফকে সেজদা দিয়েছিল, তার ১১ ভাই এবং পিতা মাতা। তারপর যদি কেউ বলে এই আয়াতগুলো রহিত করা হয়েছে। কিন্তু না, কারণ কোরআনের কোনো আয়াত রহিত হয় নি। (বাকারা, ১০৬ আয়াত)। তারপরও যদি কেউ বলে এই আয়াতের ব্যবহার ও প্রয়োগ আদম থেকে ইউসুফ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু না, আল্লাহর বিধান সকল বনি আদমের জন্য একই। এই উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, হে মোহাম্মদ, তোমার পূর্বে যে সকল রসূল এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে যেরূপ নিয়ম ছিল, তোমার ক্ষেত্রেও তাই। আমার নিয়মের কোনো পরিবর্তন নেই। (বনি ইসরাইল, ৭৭ আয়াত)।
মা হাওয়া আদম (আঃ)কে সেজদা দিয়েছে। বেহেস্তের ভিতরে আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন, আদমকে সেজদা কর। সকলেই সেজদা করিল একমাত্র ইবলিশ ব্যতিত। সে অহংকার করিল এবং কাফের হয়ে গেল। এবং আল্লাহ বলিলেন হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী একসাথে জান্নাতে বসবাস কর (সূরা- বাকারা-৩৪) (সূরা- বাকারা-৩৫) এবং ইবলিশকে বলিলেন, তুমি এখান থেকে বাহির হয়ে যাও, তুমি বিতাড়িত। (সূরা- হিযর-৩৪), (সূরা-সাদ-৭৭)। এই ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, বেহেস্তের ভিতরে মা হাওয়া আদম আঃ-কে সেজদা দিয়েছে। কারণ আয়াতে এসেছে, মা হাওয়া বেহেস্তের ভিতর উপস্থিত ছিল (সূরা- বাকারা-৩৫)। আর বেহেস্তের ভিতরে যারা ছিল তারা সকলেই সেজদা করিল একমাত্র ইবলিশ ব্যতিত। (সূরা-বারাকা-৩৪)। কাজেই এক ইনসান আরেক ইনসানকে আল্লাহর খলিফা হিসাবে কেবলা করে সেজদা দিতে পারবে না এই কথার কোন ভিত্তি নাই। অনেকেই বলে সেজদার হুকুম ছিল, ফেরেস্তা ও জ্বীন সম্প্রদায় ইনসান সম্প্রদায়কে সেজদা করবে, তাদের এক কথা ঠিক নহে, কারণ ওয়াস যুদুলী ইনসানা, তোমরা মানুষকে সেজদা কর এমন আয়াত আসে নাই। যদি এমন আয়াত আসত, তাহলে মা হাওয়া যেহেতু ইনসান, সেহেতু তিনি সেজদাকারীর আওতাভুক্ত হইতেন না, বরং তিনি সেজদাযোগ্য হইতেন। যেহেতু আয়াতে এসেছে, ওয়াস যুদুলী আদামা, তোমরা আদমকে সেজদা কর, সেহেতু মা হাওয়া ইনসান হওয়া সত্ত্বেও যদি আদমকে সেজদা না দিতেন তা হলে ইবলিশের মত কাফির হয়ে বহিস্কৃত হইত এটা নিশ্চিত। অনেকেই বলে, আদম আঃ-কে সেজদার হুকুম শুধু ফেরেস্তাদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল, এটা অন্য কোন সম্প্রদায়ের জন্য ছিলনা। তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ ইবলিশ ছিলেন জ্বীন জাতি (সূরা-ক্বাফ -৫০)। ইবলিশ জ্বীন জাতিয় হওয়া সত্ত্বেও যখন আদমকে সেজদা না দিয়ে কাফের (সূরা-বারাকা-৩৪)। তাতে প্রমাণ হয় যে, সেজদার হুকুম শুধু ফেরেস্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, বরং সকল সৃষ্টির জন্য ছিল। বিধায় মা হাওয়া ঐ সেজদার আওতাভুক্ত ছিল, এতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ সেজদার হুকুম ছিল আল্লাহর খলিফাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, আর আদমকে আল্লাহ খলিফা হিসাবে নির্ধারণ করেছিলেন। (সূরা- বাকারা-৩০)। যেহেতু মা হাওয়া খেলাফত প্রাপ্ত নহে, তাই তিনি ইনসান হওয়া সত্ত্বেও ঐ সেজদা না করে অপরাধি হইতেন, এটা নিশ্চিত। কারণ জমিনের বুকে আল্লাহ খলিফা পাঠিয়েছেন সকল সৃষ্টির উপর তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন এই উদ্দেশ্যে। শুধু ফেরেস্তা ও জ্বীনদের উপর আদম আঃ প্রতিনিধিত্ব করবেন এমন নহে, বরং ফেরেস্তা, জ্বীন ও ইনসানদের উপরও আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে আদম আঃ দায়িত্ব পালন করবেন। জন্মসূত্রে কিন্তু সকল বনি আদম খলিফা নহে, পৃথিবীতে যারা ঈমান আনবে এবং সৎ কর্ম করবে, তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। (সূরা-নূর-৫৫)। যাকে আল্লাহ খেলাফত দিবেন, তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন, বাকী বণি আদমের উপর। তাই বেহেস্তের ভিতরে আদম আঃ শুধু ফেরেস্তা ও জ্বীন সম্পদায়ের জন্যই খেলাফত ছিলেন না, বরং মা হাওয়ার উপর ও তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আর তাই মা হাওয়া আল্লাহর খলিফা হিসাবে আদম আঃ কে মেনে নিয়েই সেজদা দিয়েছেন এটা নিশ্চিত। আর তাই দুনিয়াতে সকল স্ত্রীগণ তাদের স্বামীর আনুগত্য করে আসছে।
তারপরও প্রিয় পাঠক আপনাদের জেনে রাখা ভাল যে, যদিও সকল সৃষ্টির জন্য আদমকে সেজদার হুকুম ছিল, তবে কেন আয়াতে ফেরেস্তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, এক সময় আল্লাহ ফেরেস্তাদের অবগতির জন্য ঘোষণা করেছিলেন যে, জমিনের বুকে আমি প্রতিনিধি নির্ধারণ করিব। (সূরা- বাকারা-৩০)। তখন শুধু ফেরেস্তারা দ্বি-মত পোষণ করেছিল, (সূরা- বাকারা-৩০)। অন্য কোন সম্প্রদায় দ্বিমত পোষণ করে নাই বিধায় সেজদার সময় ফেরেস্তাদের কথা উল্লেখ করে বলেছে, যেন কোন ভাবেই কোন অযুহাতে ফেরেস্তারা এই সেজদা থেকে বিরত না থাকে। যদিও বেহেস্তের ভিতরে আদম সেজদার ঘটনা ঘটিয়েছে, কিন্তু এর কার্যকারিতা বেহেস্তের ভিতরেই সীমাবদ্ধ নহে বরং দুনিয়াতে বনি আদমদের মধ্যে প্রচলিত আছে, যেমন ইউসুফ আঃকে সেজদা করল তার এগার ভাই। (সূরা- ইউসুফ-১০০)। সকল নবীগণের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক সেজদার সময় তোমাদের নিজের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর। (সূরা- আরাফ-২৯)। কাজেই আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করাই ইবলিশ মুক্তির একমাত্র পথ।
আসলে আদমের নিমিত্তে সেজদার আয়াতগুলি দিয়ে খলিফা আদমকে সেজদার মাধ্যমে পরবর্তীতে রিসালাতের ভারপ্রাপ্ত রসূলগণকে কেবলা করে আল্লাহকে সেজদা করার বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল আদম সেজদার মূল রহস্য বা উদ্দেশ্য। যারা বর্তমানে যে কোনো কারণে আদম কাবায় সেজদা থেকে দূরে থাকে, তারা ঐসকল আয়াতগুলো অর্থাৎ আদমের নিমিত্তে সেজদার আয়াতগুলির উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার সামিল বলে গণ্য হবে। কিন্তু আল্লাহর কোনো আয়াতের উদ্দেশ্য কেউ ব্যর্থ করতে পারবে না (হুদ, ২০ আয়াত)। কাজেই আল্লাহ পাকের কোনো আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে, এমন বুঝ অন্তরে পোষণ না করাই ভাল। তারপরও যারা আল্লাহর আয়াতের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (হজ, ৫১ আয়াত)। যারা রসূলগণের মাধ্যমে আদম কাবায় সেজদা করে নি তারাই ইবলিসের অনুসারী, কাফের। কারণ ইবলিস আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (বাকারা, ৩৪ আয়াত)। ইবলিস এবং ইবলিসের অনুসারীগণ মোমেন নয়। এরা বলে আমরা আল্লাহ ও আখিরাত বিশ্বাস করি (বাকারার ৮ আয়াত), এবং আরো বলে আমরা আল্লাহ বিশ্বাস করি ও রসূল ও বিশ্বিাস করি (নুর, ৪৭ আয়াত)। এরা আরো বলে আমরা আল্লাহর আনুগত্যও রসূলের আনুগত্য স্বীকার করি (নুর, ৪৭ আয়াত)। কিতাবিদের দল বিশেষের মধ্যে ইবলিসের অনুসারী আছে (ইমরান, ১০০ আয়াত)। অর্থাৎ ইবলিস ও তার অনুসারীগণও কিতাব বিশ্বাস করে। ইবলিস জান্নাত ও জাহান্নামও বিশ্বাস করে। কারণ তাকেতো জান্নাত থেকেই বহিষ্কার করা হয়েছিল (বাকারা, ৩৬ আয়াত) এবং (ত্বাহা, ১২৩ আয়াত)। ইবলিস ফেরেস্তাও বিশ্বাস করে, কারণ তাকে তো ফেরেস্তাদের সাথেই আদম সেজদার হুকুম দেওয়া হয়েছিল, (হিজর, ৩০ আয়াত)। ইবলিস পুনরুত্থান দিবসও বিশ্বাস করে (সাদ, ৭৯ আয়াত)। ইবলিস ও ইবলিসের অনুসারীদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাতের দুর্ভোগ নিদৃষ্ট, যদিও তারা লোক দেখানো ছালাত আদায় করে (মাউন, ৬ আয়াত)। যেহেতু ইবলিস জিন জাতীয় (কাফ, ৫০ আয়াত) সেহেতু ইবলিসও আল্লাহর ইবাদত করে (জারিয়া, ৫৬ আয়াত)। ইবলিস আল্লাহকে প্রভু বলে (হিজর, ৩৬ আয়াত)। ইবলিস আল্লাহকে সেজদা করে (রাদ, ১৫ আয়াত)। ইবলিস আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে (ইমরান, ৮৩ আয়াত)। ইবলিস আল্লাহরই পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে (হাদীদ, ১আয়াত) এবং (হাশর, ২৪ আয়াত)। উপরিউক্ত বিশ্বাস অনুসারে উপরিউক্ত কর্মগুলো করার পরও ইবলিস একমাত্র আদমকে সেজদা না দেওয়ার কারণেই কাফের (বাকারা, ৩৪ আয়াত) এবং (সাদ, ৭২ আয়াত)। ঠিক একই ভাবে যারা উপরিউক্ত বিশ্বাস অনুসারে উপরিউক্ত কর্মগুলো করার পরও একমাত্র সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় সেজদা দেয়না তারাই ইবলিসের অনুসারী হবে। যেহেতু পূর্ব আলোচনায় আমরা বুঝলাম খেলাফত যেখানে, সেজদা সেখানে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেজদা। খেলাফত প্রাপ্ত খলিফাগণই সম্যক গুরু। আর সম্যক গুরুগণই বর্তমান রসূল। মোমেনগণ বলেন, আমরা এই বর্তমান রসূলেরই অনুসরণ করি (ইমরান, ৫৩ আয়াত)। এই রসূলগণ তোমাদের পবিত্র করবেন, কারণ প্রত্যেক বনি আদমের সাথে ইবলিস যুক্ত আছে (ত্বাহা, ১২৩ এবং যুখরুফ ৩৬ আয়াত)। এই ইবলিস মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কেউ পরিত্রাণ পাবে না (শুআরা, ৮৯ আয়াত)। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ সম্যক গুরুর কাবায় সেজদা না দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে ইবলিস মুক্ত হতে পারবে না। যখনই কেউ সম্যক গুরুর কাবায় সেজদা দিবে, তখনই সে ইবলিস মুক্ত হবে। কারণ ইবলিস কখনো আদম কাবায় সেজদার শামিল হবে না (হিজর, ৩০ আয়াত)। আর সম্যক গুরুর কাবায় সেজদার মাধ্যমেই ইবলিসকে দেহ মন থেকে দূরীভূত করার একমাত্র উপায় আর এটাই হচ্ছে সালাত। এইজন্য আল্লাহ বলেন, ছালাত হচ্ছে সেই কাজটি যা করলে ইবলিস দূরীভূত হয় (আনকাবুত, ৪৫ আয়াত)। এই আয়াতে নাহাইয়া শব্দ এসেছে, নাহাইয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে দূরীভূত করা। অভিধান (পৃ. ২৩৮৩)। এই আদম কাবাই সেজদা না দিয়ে যারা প্রচলিত প্রক্রিয়ায় লোক দেখানো সালাত নিয়মিত ভাবে আদায় করে, সালাতের সময় তাদের মন স্থির থাকে না। কারণ ঐসময় তাদের দেহ মনের সাথে ইবলিস শামিল থাকে ফলে আনকাবুত, ৪৫ আয়াতের প্রয়োগ তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। আল্লার কোনো আয়তকে কেউ ব্যর্থ করতে পারবে না (হুদ, ২০ আয়াত)। পক্ষান্তরে যারা আদম কাবায় সেজদা করে তাদের সাথে ইবলিস যুক্ত থাকেনা বিধায় সালাতে তাদের মন একনিষ্ঠ হয়। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, এদের উপর ইবলিসের কোনো ক্ষমতা থাকবে না (হিজর, ৪০ আয়াত)। এই আদম কাবায় সেজদা দেওয়াই হচ্ছে সেরাতুল মুস্তাকিম, যা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে (হিজর, ৪১ আয়াত)। আর ইবলিস এই সিরাতুল মোস্তাকিমেই উৎ পাতিয়া বসিয়া আছে, এখান থেকে সকলকে পথ ভ্রষ্ট করার জন্য (আরাফ, ১৬ আয়াত)। যে কায়দায় ইবলিস বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছিল ঠিক একই ভাবে মানুষকেও বিভ্রান্তি করবে (আরাফ, ১৬ আয়াত)। আর ইবলিস এই সেজদা থেকেই মানুষকে বিরত রাখার চেষ্টা করে (নামল, ২৫ আয়াত)। সম্যক গুরুতে যারা বিশ্বাসী তারাই মোমেন, আর মোমেনদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, তোমরা সেজদা কর (ঐ সেজদা, যে সেজদা ইবলিস করে নি) (হজ, ৭৭ আয়াত)। কাজেই সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় সেজদা দেওয়াই হচ্ছে ঈমানের পথ আর এর বিপরীত অর্থাৎ আদম কাবায় সেজদা না দেওয়া হচ্ছে ইবলিসের পথ। ইবলিসের পথে যারা থাকবে তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন একমাত্র ইমান এবং সৎ কর্ম ব্যতীত সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত (আসর, ১ আয়াত)। এইজন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা ইবলিসের অনুসরণ করোনা, ইবলিস তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (বাকারা, ২০৮ আয়াত)। বরং তোমরা অনুসরণ কর তাদের যারা সঠিক পথে আছে (ইয়াসিন, ২১ আয়াত)। সঠিক পথ বলতে ইবলিসের বিপরীত পথ। এটা হচ্ছে সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় সেজদার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করা। এই জন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা আত্মসমর্পণ না করে মরিও না। (ইমরান, ১০২ আয়াত)। যারা সম্যক গুরু তথা এই রসূলের সঙ্গ ধারণ না করে মৃত্যুবরণ করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সেই দিন তারা নিজের হস্ত দংশন করে আফসোশ করে বলবে, হায়, আমরা যদি এই রসূলের সঙ্গ ধারণ করে ঐ সৎ পথটা গ্রহণ করিতাম (ফুরকান, ২৭ আয়াত)। কাজেই যারা সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় সেজদা না দিয়ে প্রচলিত প্রক্রিয়ায় সকল ইবাদত বন্দেগী করল তার পরও তারা ইবলিসের অনুসারী। কাজেই একজন সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় সেজদা দেওয়াই হচ্ছে মুক্তির পথ। এটাই হচ্ছে পবিত্র কুরআনের বুঝ, এটা যারা অপছন্দ করেন তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, আমি যা নাযিল করেছি তা যারা অপছন্দ করেন তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে (মোহাম্মদ, ৯ আয়াত)।
আদম সেজদার রহস্য এবং উদ্দেশ্য অনুধাবন করে আদম কাবায় সেজদা করে ইবলিসের অনুসরণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখায় মানবমুক্তির পথ।
আল্লাহ ও তার ফেরেস্তাগণ নবী (সা.) এর উত্তম প্রশংসা করেন (আহযাব, ৫৬ আয়াত)। হে নবী তোমাকে কাউসার দান করা হয়েছে, অতঃপর তুমি তোমার প্রভুর উত্তম প্রশংসা কর (কাউসার, ২ আয়াত)। আল্লাহ ও ফেরেস্তাগণ মানুষের উত্তম প্রশংসা করেন, (আহযাব, ৪৩ আয়াত)। আল্লাহ বলেন হে মানুষ, তোমার প্রভুর উত্তম প্রশংসা কর (আলা, ১৫ আয়াত)। আল্লাহ বলেন, তুমি তাদের জন্য উত্তম প্রশংসা কর (তওবা, ১০৩ আয়াত)। তোমরা মাকামে ইব্রাহিমে প্রভুর উত্তম প্রশংসার স্থান নির্ধারণ কর। (বাকারা ১২৫ আয়াত)। এই সকল আয়াতে উসাল্লি শব্দ এসেছে, উসাল্লি শব্দের অর্থ উত্তম প্রশংসা করা। (আরবি অভিধান পৃ. ১৬০৭)। অনেকেই বলেন এই সকল আয়াতের উসাল্লি শব্দ দিয়ে ছালাত বুঝানো হয়েছে, কিন্তু না, উসাল্লি শব্দ সালাত অর্থে ব্যবহার করা যাবে না, কারণ হচ্ছে উসাল্লি ও সালাত দুইটিই আরবি শব্দ। দুইটি শব্দ দুইটি আয়াত। দুইটি শব্দের অর্থ দুইটি, উদ্দেশ্যও দুইটি। যদি দুইটি শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করা হয়, তাহলে একটি আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। যদি কেউ উসাল্লি শব্দ দিয়ে সালাত অর্থ করে তাহলে উসাল্লি শব্দ যুক্ত আয়াতের যে উদ্দেশ্য ছিল উহা ব্যর্থ হবে। কিন্তু না, আল্লাহর উদ্দেশ্যকে কেউ ব্যর্থ করতে পারবে না (হুদ, ২০ আয়াত)। আর যদি কেউ আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তার জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (হজ, ৫১ আয়াত)। কাজেই উসাল্লি ও সালাত এক নয় এখানে উল্লেখ্য যে, উসাল্লি ও সালাতের মধ্যে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন, সালাত হচ্ছে উপাসনামূলক শব্দ। পক্ষান্তরে উসাল্লি উপাসনামূলক শব্দ নয়, উহা প্রশংসামূলক শব্দ। উসাল্লি উপাসনার পর্যায়ে পড়ে না, কারণ এই যে, আল্লাহ তার বান্দার প্রতি উসাল্লি আদায় করে (আহযাব, ৪৩ আয়াত)। সেক্ষেত্রে উসাল্লি দিয়ে যদি উপাসনা বা প্রার্থনা বা সালাত অর্থে ব্যবহার করা হয় তাহলে আল্লাহ তার বান্দার প্রতি উপাসনা করে বা বান্দার কাছে প্রার্থনা করে বা বান্দার উদ্দেশ্যে সালাত বা নামাজ আদায় করে এমনটি বুঝায়। কিন্তু না, আল্লাহর পক্ষে এমনটি সম্ভব নয়। বরং আল্লাহ তার বান্দার প্রতি উত্তম প্রশংসা করতে পারে এটা সম্ভব বিধায় উসাল্লি শব্দ কখনো উপাসনামূলক বা প্রার্থনামূলক হবে না বরং উসাল্লি শব্দ প্রশংসামূলক।
উসাল্লি এবং সালাতের ভিতরে আরেকটি সুক্ষ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন সালাতের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে (নেছা, ১০৩ আয়াত) (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। কিন্তু উসাল্লি আদায় করার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা উল্লেখ করা হয় নি। যে কোনো সময় উসাল্লি আদায় করা যাবে। তাছাড়াও সালাতের পূর্বে তাহীর হওয়া বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া বা পবিত্র হওয়া শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে (মায়েদা, ৬ আয়াত)। পক্ষান্তরে উসাল্লি আদায় করার জন্য তাহীর হওয়া শর্ত উল্লেখ করা হয় নি। পবিত্র অপবিত্র যে কোনো অবস্থায় উসাল্লি আদায় করা যাবে, কাজেই উসাল্লি এবং সালাত ভিন্ন বিষয় বিধায় যে সকল আয়াতে উসাল্লি শব্দ এসেছে সে সকল আয়াতগুলি সালাত অর্থে ব্যবহার করা যাবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, অনেকেই বলে সালাত বা নামাজ পড়া ফরজ, কিন্তু না, সালাত বা নামাজ পড়ার কথা পবিত্র কোরআনে কোথাও উল্লেখ করা হয় নি। ইকরা অর্থ পাঠ করা, ইকরাবুস সালাত মর্মে পবিত্র কোরআনে কোনো আয়াত আসে নি বিধায় সালাত বা নামাজ পড়ার বিষয় নয়। বরং পবিত্র কোরআনে আসছে, সালাত কায়েম কর (নূর, ৫৬ আয়াত)।
এখন জানতে হবে সালাত কায়েম করার প্রক্রিয়া কি? সালাত কায়েম করার পূর্বে সালাত কি তার জানতে হবে। প্রচলিত প্রক্রিয়ায় সালাত বলতে আমরা বুঝি পবিত্র কোরআনের অংশ বিশেষ পাঠ করা, রুকু করা এবং সেজদা করা। এর মধ্যে পবিত্র কোরআনের অংশ বিশেষ পাঠ করা সালাতের অংশ নয়। কারণ আল্লাহ বলেন, "কোরআন আবৃতি কর এবং সালাত কায়েম কর" (আনকাবুত, ৪৫ আয়াত)। কাজেই কুরআন আবৃত্তি করা ও সালাত কায়েম করা এক বিষয় নয়, বরং আলাদা বিষয়। তারপরও কোরআন পাঠ করার সময় উল্লেখ আছে ফজরে কোরআন পাঠ করার (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। পক্ষান্তরে সালাতের সময়সীমা হচ্ছে সূর্য হেলে পরার পর হতে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম কর (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। কাজেই পবিত্র কোরআনের অংশ বিশেষ পাঠ করা সালতের অংশ নয়। তার পর রুকু করাও সালাতের অংশ নয়। কারণ আল্লাহ বলেন, "সালাত কায়েম কর এবং রুকু কর" (বাকারা, ৪৩ আয়াত)। সালাত কায়েম করা ও রুকু করা আলাদা বিষয়। কাজেই রুকু করা সালাতের অংশ নয়। এখন অবশিষ্ট রইল শুধু সেজদা। এখন দেখা যায় সেজদাটা সালাত থেকে পৃথক করা যায় কি না। কিন্তু না, সালাত থেকে সেজদা পৃথক করা গেল না, বরং একমাত্র সেজদাই সালাত, কারণ পবিত্র কোরআনে সেজদা কর এবং সালাত কায়েম কর কথা একই আয়াতের মধ্যে বলা হয় নি। যে আয়াতে সেজদা কর কথা আসছে, সেখানে সালাত কায়েম কর কথা আসে নি, আবার যে আয়াতে সালাত কায়েম কর আসছে, সেখানে সেজদা কর কথা আসে নি। মূলতঃ সেজদাই সালাত, (নেছা, ১০২ আয়াত)। এতে প্রমাণ হয় যে, সেজদা সালাতের অংশ।
আবার সেজদা দেওয়াই সালাতের অংশ, অর্থাৎ সেজদাই সালাত। কিন্তু সকল সেজদা সালাত নয়। কারণ আসমান ও যমিনের মাঝে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহকে সেজদা করে (রাদ, ১৫ আয়াত)। তাহলে ইবলিসও আল্লাহকে সেজদা করে, ইবলিস যে সেজদা করে সেই সেজদা সালাত নয়। বরং ইবলিস যে সেজদা করে না সেই সেজদা সালাত। ইবলিস একমাত্র রসূল চেহারায় সেজদা করে না। কারণ ইবলিস আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (বাকারা, ৩৪ আয়াত)। যখনই কোনো মানুষ রসূল চেহারায় সেজদা দিবে তখনই তার দেহ মন থেকে ইবলিস দূরীভূত হবে। যে কাজটি করলে ইবলিস দূরীভূত হয় সেটা ই সালাত (আনকাবুত, ৪৫ আয়াত) এই আয়াতে নুহাইয়া শব্দ এসেছে। নুহাইয়া শব্দের অর্থ দূরীভূত করা (আরবি অভিধান পৃ. ২৩৮৩)। ইবলিস একমাত্র রসূল চেহারায় সেজদা করে না, আর বাকী সব জায়গায় আল্লাহকে সেজদা করে, তাই যখন কেউ রসূল চেহারায় সেজদা করে তখন সেজদাকারী দেহ মন থেকে ইবলিস দূরীভূত হয় বিধায় আনকাবুত এর ৪৫ আয়াত অনুসারে রসূল চেহারায় সেজদা দেওয়াই হচ্ছে সালাত। এখন আমরা জানব সালাতে রসূল চেহারা তথা আল্লাহর চেহারা সামনে স্থির করার দলিল বা যুক্তি কি? সালাতের সময় বান্দার খেয়ালটা হবে এমন যে, নিশ্চয়ই আমি তার চেহারার উপর নিজের চেহারা ফিরাইলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন (আনআম, ৭৯ আয়াত)। এই আয়াতে দুইটি চেহারার কথা উল্লেখ আছে, অজহিয়্যা অর্থ আমার চেহারা আর অজজাহতু শব্দটা দিয়ে এখানে আল্লাহর চেহারাকে বুঝানো হয়েছে। (বিঃ দ্রঃ অজহা অর্থ চেহারা, আরবি অভিধান পৃ.নং-২৫২৮, দিশারি অভিধান, পৃ. ২৭) এখানে উল্লেখ্য যে, অজজাহতু শব্দ নিজের চেহারা অর্থ করলে আনামের ৭৯ আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। কারণ নিজের চেহারায় সেজদার সময় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মর্মে আয়াত আছে প্রত্যেক সেজদার সময় তোমাদের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর (আরাফ, ২৯আয়াত) আবার আয়াতে নিজের চেহারা আল্লাহর দিকে সমর্পণ করার কথা বলা হয়েছে (ইমরান ২০ আয়াত) এবং (বাকারা ১১২ নং) পক্ষান্তরে আনাম ৭৯ আয়াতে আল্লাহর চেহারার দিকে বান্দার চেহারাকে ফিরাতে বলা হয়েছে। এইজন্য এই আয়াতে চেহারা শব্দটা দুই বার এসেছে, অর্থাৎ অজহিয়া অর্থ আমার চেহারা আর অজজাহতু অর্থও চেহারা। এখন যদি কেউ অজজাহতু অর্থ আমার চেহারার দিকে নেয় আবার অজহিয়া অর্থ আমার চেহারা তাহলে একই আয়াতে দুইবার আমার চেহারা বলা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং আল্লাহর চেহারা ও বান্দার চেহারা বুঝাবার জন্য এই আয়াতে দুইবার চেহারার কথা উল্লেখ আসছে। সেক্ষেত্রে দুইটি চেহারার অর্থই যদি আমার চেহারা অর্থ করে তাহলে এই আয়াতের যে উদ্দেশ্য ছিল, তা ব্যর্থ হবে, কিন্তু না, আল্লাহর আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা যাবে না (হুদ, ২০ আয়াত)। বরং যারা আল্লাহর আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (হজ, ৫১ আয়াত)। কাজেই আনামের ৭৯ আয়াত অনুসারে সালাতের সময় আল্লাহর চেহারা দিকে নিজের চেহারাকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমেই সালাত কায়েম করতে হবে। যেহেতু রসূল চেহারাই আল্লাহর চেহারার ঠিকানা এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিধায় রসূল চেহারায় সেজদা দেওয়াই সালাত। এখন আমরা জানব রসূল চেহারা সেজদা কারীর লক্ষণ কী? রসূল চেহারায় সেজদাকারীর লক্ষন তার চেহোরার মধ্যেই পরিস্ফুটিত হবে। (ফাতহ, ২৯ আয়াত)। সেজদাকারী বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে তারা দুনিয়াবী বিষয় মোহ থেকে মুক্ত থাকবে। দুনিয়াতে সহজ সরল জীবন যাপন করবে। অন্যায়-অত্যাচার জোর ঝুলুম, ধোকাবাজী, মিথ্যাচার, সুদ, ঘুষ বিভিন্ন পাপ কর্ম থেকে এরা বিরত থাকবে। কারণ এই যে ইবলিস মানুষের কাছে পাপ কর্মকে শোভন করে ধরে। (হিজর, ৩৯ আয়াত)। রসূল চেহারায় সেজদা দেওয়ার পর সেই ইবলিস তার দেহ মন থেকে দূরীভূত হচ্ছে, তাই পাপ কর্মও তার মধ্য থেকে দূরীভূত হয়েছে। কিন্তু রসূল চেহারায় সেজদা না দিয়ে অর্থাৎ দেহের ভিতরে ইবলিস সংশ্লিষ্ট থাকা অবস্থায় মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন, সে পাপ কর্ম থেকে বিরত থাকবে পারবে না। তাই ইংলিশে একটি কথা আছে ঘড় নড়ফু পধহহড়ঃ ধিহঃ রঃ নঁঃ হড়হব ধাড়বঃ রঃ অর্থাৎ কেউ যা চাহেনা, কিন্তু তা এড়াতেও পারে না। কারণ যার মূলে ইবলিস অবস্থান করবে তার আচরণটাও ঠিক ইবলিসের মতোই হবে। অর্থাৎ নিজেকে পাপ মুক্ত করতে হলে পাপের কুমন্ত্রণা দানকারী ইবলিস (ক্বাফ, ১৬ আয়াত) কে মুক্ত করা। ইবলিস মুক্ত না হয়ে যতই পাপ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা হউক না কেন তা কখনো সম্ভব নয়। কাজেই পাপ মুক্ত হতে হলে নিজেকে ইবলিস মুক্ত হতে হবে, আর ইবলিস মুক্ত হতে হলেই রসূল চেহারায় সেজদা দিতে হবে। সালাত হচ্ছে সেই কাজটি যে কাজটি করলে ইবলিস দূরীভূত হয়। (আনকাবুত, ৪৫)। এই আয়াতে নাহাইয়া শব্দ এসেছে যার অর্থ হচ্ছে দূরীভূত করা। (আরবী অভিধান, পৃ. ২৩৮৩) একমাত্র রসূল চেহারা সেজদা দিলে ইবলিস দূরীভূত হয়। কারণ ইবলিস আদম কাবাই সেজদা না দিয়েই কাফির (২ : ৩৪)। এই জন্য ইবলিস আদম কাবাই সেজদাকারীর সামিল হবে না। (হিজর-৩৩)
কাজেই রসূল চেহারাই সেজদা দেওয়াই সালাত। ইবলিস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একমাত্র উপায় হচ্ছে সেজদার সময় রসূল চেহারা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করা। আর সেজদার সময় রসূল চেহারা কায়েম করাই হচ্ছে সালাত কায়েম করা। এক শ্রেণীর মানুষের জন্য সালাত কঠিন (বাকারা, ৪৫ আয়াত)। আর এক শ্রেণীর মানুষের জন্য সালাত সহজ (বাকারা, ৪৬ আয়াত)। অর্থাৎ কাফিরদের জন্য সালাত কঠিন কাজ পক্ষান্তরে মমিনদের জন্য সালাত সহজ। কারণ মমিনদের অন্তরে আল্লাহর চেহারা আছে বিধায় তারা আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে। আর আল্লাহ বলেন, "তোমরা আমার স্মরণে সালাত কায়েম কর" (ত্বাহা, ১৪ আয়াত)
সেজদা শুধু সালাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই সেজদা আবার প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করার প্রক্রিয়াও বটে। তবে প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলে প্রভুর কাছে প্রত্যাবর্তন করার স্থল বা ঠিকানা বা একটি কেবলার অনুসরণ প্রয়োজন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, 'যার ইচ্ছা সে তার প্রভুর দিকে একটি প্রত্যাবর্তন স্থল বা কেবলা স্বরূপ ঠিকানা সাব্যস্ত করুক। (নাবা, ৩৯ আয়াত)। এই কেবলা হচ্ছে দুই প্রকার (১) একটি হচ্ছে বাহ্যিক কেবলা (২) অপরটি হচ্ছে আত্মিক কেবলা। বাহ্যিক কেবলা হচ্ছে মসজিদুল হারাম শরীফ (বাকারা, ১২৫ আয়াত)। আর আত্মিক কেবলা হচ্ছে আল্লাহর চেহারা আর আল্লাহর যে চেহারা আছে, তা কাসাসের ৮৮ আয়াত এবং বাকারার ১১৫ আয়াতে উল্লেখ আছে। আর আল্লার সেই চেহারার উপরই অর্থাৎ সেই আত্মিক কেবলাই সকলকে আত্মসমর্পণ করাই আল্লাতে আত্মসমর্পণ করা। আত্মসমর্পণ করার প্রক্রিয়া হিসেবে আল্লাহ বলেন, বল্ আমার চেহারা দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। (ইমরান, ২০ আয়াত)। এই মর্মে আল্লাহ আরো বলেন, যে কেউ তার চেহারা দ্বারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করল, তাদের কোনো ভয় নেই (বাকারা, ১১২ আয়াত)। বান্দার চেহারা আল্লাহর চেহারার উপর সমর্পণ করা হচ্ছে প্রকৃত আত্মসমর্পণ। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আত্মসমর্পণ করার সময় বান্দার খেয়ালটা হবে এমন যে, "নিশ্চয়ই আমি, তার চেহারার উপর, নিজের চেহারা ফিরাইলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আনআম, ৭৯ আয়াত)। এইভাবে যারা আল্লাহর চেহারা যাযন করে না তাদের অন্তরে আল্লাহ সম্পর্কে একটা অনুমান ও কাল্পনিক ধারণা তৈরি হয়। যাহা আল্লাহ সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য নহে। (সূরা ইউনুস : ৩৬)। আল্লাহ সম্পর্কে সেই অনুমান বা কাল্পনিক ধারণাটা আল্লাহ সম্পর্কে একটা মেসেল বা উপমার শামিল হয়। যা সূরা নহলের ৭৪ নং আয়াতের পরিপন্থী। আর যারা আল্লাহর চেহারা অন্তরে যাযন করে তারা মুশরেকদের দলভুক্ত নহে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমার চেহারা আল্লাহর চেহারার দিকে ফিরাইলাম। আমি মুশরিকদের দলভুক্ত নই। (সূরা আনআম : ৭৯) এই আয়াতে দুইটি চেহারার কথা উল্লেখ আছে, অজহিয়্যা অর্থ আমার চেহারা আর অজ্জাহ্তু শব্দটা দিয়ে এখানে আল্লাহর চেহারাকে বুঝানো হয়েছে যেটা হচ্ছে বান্দার আত্মিক কাবা। প্রত্যেক ব্যক্তিরই কেবলা স্বরূপ এমন একটি নির্দিষ্ট চেহারা থাকতে হবে, যেদিকে সে নিজেকে সমর্পণ করবে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "লিকুল্লি অজজাহ্তু হুওয়া মুয়াল্লিহা" অর্থ "প্রত্যেকের একটি কেবলা সরূপ চেহারা আছে, যেদিকে সে প্রত্যাবর্তন করে।" (বাকারা, ১৪৮ আয়াত)। (বিঃ দ্রঃ অজহুন অর্থ চেহারা, আরবি অভিধান, পৃ. ২৫২৮) দিশাহী অভিধান, পৃ. ২৭)। আর আল্লাহর সেই চেহারাটাই হচ্ছে, আত্মিক কাবা যেটা একমাত্র মমিনগণ অনুসরণ করে থাকে। পক্ষান্তরে বাহ্যিক কাবা মমিন এবং কিতাবিগণ উভয়ই অনুসরণ করে থাকেন। এখানে উল্লেখ্য যে, বাহ্যিক কাবা পরিবর্তনশীল, পক্ষান্তরে আত্মিক কাবা পরিবর্তনশীল নয়। আত্মিক কাবাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে অর্থাৎ ইসলামের মধ্যে মুনাফিক চিিহ্নত করার জন্য আল্লাহ "বাহ্যিক কাবা পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন" (বাকারা, ১৪২ আয়াত)। সেক্ষেত্রে শুধু মমিনগণই সেই নির্দেশ অনুসারে বাহ্যিক কাবা (মসজিদুল হারাম শরীফ) পরিবর্তন করে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ ফিরালেন, পক্ষান্তরে কিতাবিরা তাদের পূর্বের কাবার দিকেই রয়ে গেল। তারা মমিনদের সেই আত্মিক কাবার অনুসরণ করলেন না এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "তোমরা যদি সমস্ত দলিলও পেশ কর তারপরও কিতাবিরা তোমাদের কেবলার অনুসরণ করবে না (বাকারা, ১৪৫ আয়াত)। কারণ কিতাবিদের আত্মসমর্পণ ও মমিনদের আত্মসমর্পনের মধ্যে পার্থক্য আছে, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "আসমান জমিনে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে" (ইমরান, ৮৩ আয়াত)। এই আয়াত অনুসারে ইবলিস এবং ইবলিসের অনুসারী মোনাফেক কিতাবিরাও আল্লাতে আত্মসমর্পণ করে, আবার আল্লাহ বলেন, হে মমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ কর (বাকারা, ২০৮ আয়াত)। মমিনদের আত্মসমর্পণ এবং কিতাবিদের আত্মসমর্পণ এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, কিতাবিরা চেহারা বিহীনভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে পক্ষান্তরে মমিনগণ তাদের অন্তরে আল্লাহর চেহারা মোবারক স্থির করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
ইবলিস এবং ইবলিসের অনুসারীদের সেজদা এবং মমিনদের সেজদার ভিতরেও একটি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ বলেন, আসমান ও যমিনে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহকে সেজদা করে (রাদ, ১৫ আয়াত)। এই আয়াত অনুসারে ইবলিসের অনুসারীরাও আল্লাহকে সেজদা করে। আবার আল্লাহ বলেন, হে মমিন, তোমরা আল্লাহকে সেজদা কর (হজ, ৭৭ আয়াত)। ইবলিস এবং ইবলিসের অনুসারীগণ চেহারাবিহীন ভাবে আল্লাহকে সেজদা করে, অর্থাৎ নিঃআকারে আল্লাহকে সেজদা করে, পক্ষান্তরে মোমিনগণ রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করে আল্লাহ পাকের সেই চেহারা মোবারক অন্তরে স্থির করে আল্লাহকে সেজদা করে। তাহলে দেখা গেল মুমিন এবং কাফেরদের মধ্যে পার্থক্য হল চেহারার মাধ্যমে আল্লাকে বিশ্বাস করা ও না করা। আর যারা রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করে আল্লার সেই চেহারায় বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহর চেহারার উপর সেজদার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে তারাই প্রকৃত আত্মসমর্পণকারী মুসলিম।
